চাঁপাইনবাবগঞ্জ ট্রাফিক বিভাগকে মাসিক চাঁদা দিয়ে অবাধে চলছে নিষিদ্ধ যানবাহন

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ট্রাফিক বিভাগকে মাসিক চাঁদা দিয়ে অবাধে চলছে নিষিদ্ধ যানবাহন

“টিআই গোলাম সারোয়ার সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ”

নিজস্ব প্রতিবেদক : ট্রাফিক পুলিশের চোখের সামনে আইন অমান্য করে চলছে অবৈধ যানবাহন। শহরের মধ্যে দিনের বেলায় ঢোকার অনুমতি নেই, এমন গাড়িও দিনের বেলায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সড়কে। লক্কড়ঝক্কড় রংচটা গাড়িগুলো ঠিকই আন্তঃজেলা রুটে চলছে। এখানে সেখানে পার্কিং করা হচ্ছে বাস-ট্রাক। এসবের দিকে নজর নেই ট্রাফিক পুলিশের। ট্রাফিক সার্জেন্টদের একমাত্র টার্গেটই যেন মোটরসাইকেল। করোনাকালিন সময়ে সরকারি নির্দেশনায় দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল গণপরিবহন। সড়কে গণপরিবহন বন্ধ থাকায়, বন্ধ ছিল চাঁদাবাজিও। তবে গণপরিবহন চালুর পর আবারও পুরোনো স্টাইলে চাঁদাবাজি শুরু করেছে ট্রাফিক পুলিশ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-রাজশাহী মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে দেদার চলছে নিষিদ্ধ ও রেজিস্ট্রেশনবিহীন যানবাহন। ট্রাফিক বিভাগকে মাসিক চাঁদা দিয়ে নিষিদ্ধ যানবাহন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সামনেই চলাচল করছে অবাধে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে দেশের বিভিন্ন রুটে চলাচল করা পরিবহনেও মাসিক চুক্তিতে চাঁদা দিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অনুসন্ধান আরও বলছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে দেশের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী নাইটকোচগুলোর জন্য মাসে ২ হাজার টাকা করে ধার্য করেছে ট্রাফিক পরিদর্শক। পরে মাসোহারার টাকা মাস্টার সমিতির মাধ্যমে যাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ বিভাগে। এ চাঁদাবাজিতে টিআই গোলাম সারোয়ার সরাসরি জড়িত বলে অনেকে মনে করছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-রাজশাহী মহাসড়ক ও আন্তঃজেলা রুটে চলাচলের অনুপযোগী লক্কড়ঝকড় মহানন্দা, গেটলকসহ বিভিন্ন পরিবহন সচল রাখতেও মাসিক চাঁদা পৌঁছাতে হয় ট্রাফিক অফিসে। ফিটনেসবিহীন বাস ও ট্রাক থেকে প্রতি মাসে লক্ষাধিক টাকা চাঁদা ওঠে।

এসব ছাড়াও অবৈধ টার্মিনাল, সড়ক-মহাসড়ক দখল, বাস-মিনিবাস, সিএনজি, মাহিন্দ্র, নসিমন থেকে মাসোহারা হিসেবে প্রতি মাসে আরও কয়েক লাখ টাকা চাঁদা পায় ট্রাফিক পুলিশ। এসব সমিতির মাধ্যমে চাঁদার টাকা পৌঁছে যাচ্ছে ট্রাফিক অফিসে।

এছাড়াও ট্রাক মালিক সমিতি ও মিল মালিকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ চাঁদা নেয় ট্রাফিক বিভাগ। শহরের রড সিমেন্ট ব্যবসায়ীদের কাছে থেকেও নিয়মিত চাঁদা নেয় ট্রাফিক পুলিশ। সিএনজি স্ট্যান্ড, মাহিন্দ্রা, মাইক্রো স্ট্যান্ড ও সোনামসজিদ স্থলবন্দর থেকেও নিয়মিত চাঁদা নেয় ট্রাফিক বিভাগ।

তথ্যমতে, জেলায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সমিতির অন্তভূক্ত ৮০ ও শিবগঞ্জ সমিতির অন্তভূক্ত ১৩০ টি মাহিন্দ্রা গাড়ি সড়কে চলাচল করছে। প্রতি গাড়ি থেকে মাসে ৭০০ টাকা করে চাঁদা নেয়া হয়। সে হিসেবে শুধু মাহিন্দ্র থেকে মাসে চাঁদা আদায় হয় ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। এসব চাঁদার টাকা সমিতির নেতা ও ট্রাফিক বিভাগে মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হয়। জেলায় তিন শতাধিক সিএনজি চলাচল করে। ট্রাফিক পুলিশ ম্যানেজের নামে প্রতি সিএনজি থেকে মাসে ৩০০ টাকা করে নেয়া হয়। প্রতিমাসে সিএনজি থেকে চাঁদা আদায় হয় ৯০ হাজার টাকা। এছাড়াও মাছ বাজার ও কাঁচাবাজরে আসা কৃষিপণ্যের পরিবহন থেকেও প্রতিমাসে লক্ষাধিক টাকা চাঁদা নেয় ট্রাফিক পুলিশ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বিভিন্ন রুটে চলাচল করা ট্রাক থেকে ২ হাজার টাকা করে চাঁদা নেয়া হয়। এসব ট্রাক নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য দালালদের মাধ্যমে টোকেন সরবরাহ করা হয়। একেক মাসে একেক রঙ্গের টোকেন ও মেয়াদ উল্লেখ্য থাকে। গৌরিপুর, মায়ের দোয়া, আল্লাহর দান ও সাতক্ষিরাসহ বিভিন্ন সাংকেতিক নামে এসব টোকেন সরবরাহ করে ট্রাফিক পুলিশ। দেশব্যাপি এই চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক রয়েছ।

অভিযোগ রয়েছে, ট্রাফিক পরিদর্শক (টিআই) গোলাম সারোয়ার চাঁপাইনবাবগঞ্জে যোগদানের পর সড়ক শৃঙ্খলা ফেরাতে দ্বায়িত্ব পালনে দেখা যায়নি। সারাদিন পুলিশ সুপারের কক্ষে তদবীর আর তোশামদিতে ব্যস্ত থাকেন। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি হয়ে নিজেকে মহা ক্ষমতাধর জাহির করেন টিআই গোলাম সারোয়ার।

গত শনিবার সকাল সাড়ে ১০ টা। বিশ্বরোড মোড়ের শাহনেয়ামতুল্লাহ কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ২ টি বাস। একটি ছেড়ে যাচ্ছে; আরেকটি আসছে। যে বাসটি আসছে সেটিই রাখা হচ্ছে এলোপাতাড়ি। কলেজে প্রবেশের রাস্তাটিতে জটলা লেগেই থাকছে । বিপোরিত পাশে বসে থেকে দায়িত্ব পালন করছে ট্রাফিক পুলিশ। ট্রাফিক কনস্টেবলরা দু-একবার তাদের মুখের বাঁশি ফুঁ দিয়ে চালককে ইশারা করছেন সরে যেতে। কিন্তু কে কার কথা শোনে। তবে বাস চালকদের কোন কথা বলতেই দেখা যায়নি।

পরিবহন মালিক ও মাস্টার সমিতির লোকজন বলছেন, ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে মাসিক চুক্তি থাকে। মাসিক টাকা দিলে কাগজ বা লাইসেন্স না থাকলেও সমস্যা নাই। আর না দিলে কাগজ থাকলেও ঝামেলা করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিশ্বরোড মোড় ও শান্তিমোড়ে রাস্তার মধ্যে ট্রাফিক ছাউনে রয়েছে। এছাড়াও শহেরর ব্যস্ততম মোড়গুলোতে দিনভর ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও অধিকাংশ সময় কাউকে দেখা যায়না। পাশের চায়ের দোকান বা হোটেলে বসে থেকে দ্বায়িত্ব পালন করছে। ফলে যে যার মতো ইচ্ছে গাড়ি চালাচ্ছে। মোড়ে মোড়ে তিন চাক্কার অবৈধ যানবাহনের ভিড় লক্ষ করা গেছে। দেখেও যেন দেখেনা ট্রাফিক পুলিশ। শান্তিমোড় দক্ষিণ পাশে ও বিশ্বরোড় মোড়ের উত্তর-পশ্চিম পাশে দেখা যায় বাস ও সিএনজিগুলোতে যত্রতত্র যাত্রী তোলা হচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশের সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। এভাবে রাস্তার ওপর যাত্রী তোলার কারণে ওই এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটে । হাইড্রোলিক হর্ন বাজানো নিষেধ হলেও শহরের যেখানে সেখানে এই হর্ন কানে আসে। এমনকি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালসহ বেশ কিছু স্থানে হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ থাকলেও বেশির ভাগ চালকই তা মানছেন না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আন্তঃজেলা ও ঢাকা রুটে এখনো অসংখ্য গাড়ি চলছে যার লাইসেন্স নেই, ফিটনেস নেই, রুট পারমিট নেই। আবার কোনো কোনো গাড়ির কাগজপত্র ঠিক থাকলেও চালকের লাইসেন্স ঠিক নেই। চালকরা রাস্তায় ট্রাফিক আইন অমান্য করছে, অবৈধ পার্কিং করছে। এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা থাকলেও সেদিকে যথাযথ নজর নেই ট্রাফিক পুলিশের। কিন্তু একটি মোটরসাইকেল দেখলেই চেকপোস্টে দায়িত্বরত প্রায় সব সদস্যই যেন এগিয়ে সেটি থামানোর চেষ্টা করেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিশ্বরোড মোড়, মহানন্দা স্ট্যান্ড ও কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলকা ঘুরে দেখা গেছে রংচটা, সেই লক্কড়ঝক্কড় গাড়িগুলোই অভ্যান্তরিন ও রাজশাহী রুটে চলছে। অধিকাংশ গাড়ির বাইরের আস্তর ঠিক নেই। ভেতরে অবস্থাও মানহীন। ট্রলি নসিমন, ট্রাক্টর রড সিমেন্ট, মাটি, বালুও ইটসহ বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে চলাচল করছে। দিনের বেলায় এই গাড়িগুলো শহরের মধ্যে প্রবেশেরই কথা নয়। অথচ শহরজুড়ে অবৈধ যানবাহন দাপিয়ে বেড়ালোও এসব গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নজির খুবই কম। অবৈধ যাবহনের সংগঠন ও রড সিমেন্টের দোকানদারদের সঙ্গে অনৈতিক লেনদেন থাকায় চুপচুপ থাকে ট্রাফিক পুলিশ। আতাউল্লাহ খান নামে এক মোটরসাইকেল চালক বলেন, শহরের বেশ কয়েক জায়গায় পুলিশ তার মোটরসাইকেল থামায়। এর তো কোনো মানে হয় না। এতবার কেন রাস্তায় দাঁড় করিয়ে কাগজপত্র তল্লাশি করতে হবে। আতাউল্লাহ বলেন, এ সময় তিনি বেপরোয়া গতির যানবাহন চলে যেতে দেখেছেন পাশ দিয়ে। ট্রাফিক পুলিশের সেদিকে কোনো নজর নেই। নজর শুধু মোটরসাইকেলে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ট্রাফিক পরিদর্শক (টিআই) গোলাম সারোয়ার জানান, গত মাসে (আগস্ট) মটরযান আইনে জরিমানা আদায় হয়েছে ১১ লাখ টাকা। সব ধনের পরিবহন থেকেই এ জরিমানা আদায় হয়েছে, তবে মোটরসাইকেল থেকে জরিমানা আদায় বেশি।

 

এই রকম আরও খবর দেখুন

সর্বশেষ আপডেট

অ্যার্কাইভ ক্যালেন্ডার
সোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনিরবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১