দুঃস্বপ্ন ভুলে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন

ক্রীড়া ডেস্ক: আগের দুই দিনের বৃষ্টিতে পচেফস্ট্রুমের আকাশ ধুয়েমুছে সাফ। আরো ঝকঝকে আরো তকতকে। নীল রংকে দেখায় আরো নীল, যেন মাছরাঙার ডানা। গাছের পাতাগুলোর সবুজের গাঢ়ত্বও বেড়ে গেছে শত গুণ। ফুলে ফুলে ছেয়ে যাওয়া বেগুনি রঙের চায়নাবেরির স্নিগ্ধতা মন ছুঁয়ে যায় সবার। প্রকৃতির সেই রঙের খেলায় কী ভীষণ রকম বিবর্ণ বাংলাদেশ!
পচেফস্ট্রুম টেস্টের আগের দিন দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ। যে টেস্টটির গন্তব্য হতে পারত ড্র, সেখানে ভীষণ বিশ্রী হার মুশফিকুর রহিমের দলের। কাল সকালে উঠেই তাঁদের ছুটতে হয় ব্লুমফন্টেইনের পথে। সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু সাড়ে চার ঘণ্টার বাস ভ্রমণের। স্থানীয়দের কাছ থেকে শোনা যে ওই যাত্রাপথের দুই ধারে প্রকৃতি তার সৌন্দর্য বিলিয়ে রেখেছে অকৃপণভাবে। কিন্তু তা উপভোগ করার অবস্থায় বাংলাদেশ নেই সেভাবে। পাথুরে মুখে রাজ্যের আঁধার নিয়ে যেভাবে বাসে উঠলেন ক্রিকেটাররা, তাতে অমন পূর্বাভাস দেওয়াই যায়। সেনওয়েস পার্কসংলগ্ন স্পোর্টস ভিলেজ ছিল পচেফস্ট্রুমে বাংলাদেশ দলের নিবাস। সেখান থেকেই ব্লুমফন্টেইনে যাত্রা শুরু। কিন্তু যে দুঃস্বপ্ন উপহার দিল প্রথম টেস্ট, সেটি তাড়িয়ে মাঠে নামা তো চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। ম্যাচ শেষে কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহে কড়া ধমকে দিয়েছেন দলকে। সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমও এসে ধুয়ে দেন বোলার-ব্যাটসম্যানদের। ক্রিকেটারদের নিজেদের মধ্যেও আলোচনা হয়েছে ভুলগুলো নিয়ে। এর প্রায়শ্চিত্ত করার আরেক সুযোগ পাচ্ছে অবশ্য দল। ব্লুমফন্টেইনে সেই সুযোগটা নিতে পারলেই হয়! কিন্তু ভুলগুলো যে পিছু ছাড়ছে না কিছুতেই! বাংলাদেশ কি এত খারাপ হয়ে গেছে যে ৯০ রানে অল আউট হবে? দ্বিতীয় ইনিংসের এই ব্যাটিং ব্যর্থতার কোনো ব্যাখ্যা হয় না। আগের দিন অধিনায়ক মুশফিক যেমন অজুহাত দাঁড় করাননি, কাল মাহমুদ উল্লাহও তাই, ‘ব্যাটিং নিয়ে আমরা খুবই হতাশ। উইকেটটা খুব ভালো ছিল। যেভাবে চেয়েছিলাম, ব্যাটিংটা সেভাবে করতে পারিনি। স্কিল কাজে লাগাতে পারিনি। ছোট ভুল করেছি অনেকগুলো। ’ বড় ভুলও তো কম না। এই যেমন চতুর্থ দিন বিকেলে বৃষ্টির কারণে শেষ সেশন হতে পারেনি, পঞ্চম দিনেও ছিল বৃষ্টির পূর্বাভাস। আরেকটু রয়েসয়ে ব্যাটিং করলেই তো ম্যাচ ড্র করার সুযোগ ছিল। বৃষ্টির ব্যাপারটি মাথায় রাখা যেখানে আবশ্যিক কর্তব্য ছিল, সেটি নাকি ধর্তব্যের মধ্যেই রাখেনি বাংলাদেশ দল! এমনটাই দাবি মাহমুদের, ‘বৃষ্টি নিয়ে আমরা চিন্তা করছিলাম না। ভেবেছি, ম্যাচ কিভাবে বাঁচানো যায়। জেতা কঠিন ছিল, লক্ষ্য ছিল ড্র। প্রথম সেশন ব্যাটিং করা। কিন্তু আমরা প্রথম সেশনও পুরো ব্যাটিং করতে পারিনি। ’ তা লক্ষ্য যদি ড্র-ই হবে, তাহলে ব্যাটসম্যানরা সবাই অমন তেড়েফুঁড়ে শট মারতে গেলেন কেন? ভুল স্বীকার না করে আত্মরক্ষার বর্মই তুলে ধরেন মাহমুদ, ‘একেকজনের ব্যাটিং অ্যাপ্রোচ একেক রকম। অনেকে শুরুতে গিয়ে স্ট্রোক খেলে, সেভাবেই থিতু হয়। কিন্তু কাল আমরা কিছুই করতে পারিনি। ’ নির্বোধের মতো খেলতে গিয়ে একেকজন আউট হলেন, অথচ সেখানেও দোষের কিছু দেখছেন না সিনিয়র এই ক্রিকেটার, ‘শট খেলা দোষের কিছু না। কেউ শট খেলে সেট হয়। সে যদি বাজে বলে কয়েকটি চার মারতে পারে, তাহলে কেন নয়? তাকে নিজের খেলাই খেলা উচিত। কন্ডিশনও বিবেচনায় রাখতে হবে এবং এই ম্যাচের কন্ডিশন ব্যাটিংয়ের জন্য খুব ভালো ছিল। তবে আগেই বলেছি আমরা সামর্থ্য কাজে লাগাতে পারিনি। ’ ম্যাচ শেষে অধিনায়ক মুশফিক একাধিকবার যেচে পড়ে বলেছেন একটি কথা। গত দু-তিন বছরে বাংলাদেশ ক্রিকেট যে সম্মান আদায় করেছে, সেটি যেন চলে না যায়। তাঁর ওই আকুতির সঙ্গে সহমত মাহমুদও, ‘অবশ্যই আমাদের মধ্যে এটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মুশফিকের সঙ্গে আমি একমত। আমরা অনেক বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকায় এসেছি। নিউজিল্যান্ডে গিয়েও সাকিব ডাবল সেঞ্চুরি করেছে, মুশফিক দেড় শ রানের ইনিংস খেলেছে। এই ছোট ছোট জিনিসগুলো আমাদের আত্মবিশ্বাস দেয় যে দক্ষিণ আফ্রিকা যেমন উইকেটই বানাক, আমাদের তা দেখার বিষয় নয়। নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারলেই হয়। ’ তবে পচেফস্ট্রুমে যেমন ঘরের মতো উইকেট পেয়েছে বাংলাদেশ, ব্লুমফন্টেইনে তা হওয়ার সম্ভাবনা কম। সবাই যে সমস্বরে অবাক হওয়ার কথা জানিয়ে যাচ্ছেন, তাঁরা বোধ করি দ্বিতীয় টেস্টে চমকে যাবেন না। দক্ষিণ আফিকার অধিনায়ক ফাফ দু প্লেসিও যে প্রথম টেস্টের উইকেট নিয়ে নিজের ক্ষোভের কথা বলেছেন প্রকাশ্যে! ব্লুমফন্টেইনে তাই ঘাসে ছাওয়া প্রথাগত দক্ষিণ আফ্রিকান উইকেটই হওয়ার কথা। প্রথম টেস্টের ‘চেনা’ উইকেটেই অমন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল বাংলাদেশ, সেখানে অমন ২২ গজে করবে কী? ম্যাচ জিতে সিরিজ ড্র করা সম্ভব? ছোট্ট শব্দে মাহমুদের জবাব, ‘ইনশাআল্লাহ। ’ আশা! পচেফস্ট্রুমের হতাশার কম্বলের নিচে গুটিশুটি মেরে পড়ে থাকা ওই আশাকে সম্বল করেই তো বাংলাদেশ দলের ব্লুমফন্টেইন যাত্রা!

এই রকম আরও খবর দেখুন

সর্বশেষ আপডেট

অ্যার্কাইভ ক্যালেন্ডার
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১