প্রাথমিক পরীক্ষা বাণিজ্য: অবৈতনিক শিক্ষার চ্যালেঞ্জ

উপচার ডেস্ক: আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রাথমিক শিক্ষা বৈতনিক হতে চলেছে। প্রাথমিক শিক্ষা আজ যেন গরিব মানুষের সন্তানদের কাছে শাঁখের করাতের মতো। প্রাথমিক শিক্ষা নোট, গাইড, কোচিং ও পরীক্ষার ফি বাণিজ্যে যন্ত্রণাকাতর হয়ে পড়ছে। বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে তিনটি পরীক্ষা। ভালোভাবে পাসের জন্য গাদা গাদা নোট, গাইড ও সাজেশন পাঠ্যপুস্তককে অকার্যকর করে ফেলেছে। শিক্ষকের তীব্র সংকট। পাঠদানবহির্ভূত কর্মযজ্ঞে শিক্ষকরা ব্যস্ত থাকায় অভিভাবকরা সন্তানদের বিদ্যালয়ের সময়ের পর কোচিং করাতে বাধ্য হন; যা অসচ্ছল অভিভাবকদের বেদনাহত করে।

বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতি অনেকটা হাতুড়ে ডাক্তারের চিকিত্সার মতো। হাতুড়ে ডাক্তার যেমন রোগীর সার্বিক পরীক্ষা না করে লক্ষণ শুনে চিকিত্সা করেন, তেমনি পরীক্ষা পদ্ধতি শিক্ষার্থীর সার্বিক দিক যাচাই না করে সনদ দেয়। ফলে শিক্ষার্থীর সার্বিক মেধার মূল্যায়ন হয় না। তাই প্রয়োজন প্রাথমিকে একটি আদর্শ মূল্যায়ন পদ্ধতি।

উচ্চ বিদ্যালয়ে বছরে দুটি পরীক্ষা। ছোট্ট ছোট্ট শিশুর জন্য বছরে তিনটা পরীক্ষাসহ পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনীর জন্য অতিরিক্ত দুটি মডেল টেস্ট। আগে পরীক্ষার সব দায়িত্ব ছিল বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর। প্রাথমিক শিক্ষায় পরীক্ষা ফি প্রথা শুরু থেকে চলে আসছে। তখন ফির অতিরিক্ত টাকা থেকে গরিব শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ দেয়া এবং বিদ্যালয়ের ছোটখাটো খরচ মেটানো হতো। বর্তমানে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের টাকা জমা হয় উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে। ২০১৭ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের রেট দু-তিন গুণ বৃদ্ধি করে। ফলে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার তহবিলে বিপুল অংকের টাকা উদ্বৃত্ত থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ভাউচারে অতিরিক্ত দেখিয়ে উদ্বৃত্ত টাকা আত্মসাত্ করা হয়। প্রজ্ঞাপনে উন্নত কাগজে নির্ভুল প্রশ্নপত্র প্রণয়নের কথা থাকলেও বেশির ভাগ উপজেলায় তা মানা হচ্ছে না। বাড়তি টাকা দিয়ে মেধাবীদের উপজেলাভিত্তিক পুরস্কৃত করার নির্দেশনা দেয়া আছে। মেধাবীরা সাধারণত বেশির ভাগই সচ্ছল পরিবারের সন্তান হওয়ায় পুরস্কার বেশির ভাগ তাদেরই ভাগ্যে জুটবে। এ পুরস্কার অনেকটা তেলা মাথায় তেল ঢালার মতো। এদিকে গরিব মানুষের পরীক্ষার ফি বাবদ সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক পঞ্চম শ্রেণীর জন্য ৩৫+৩৫+৩৫+৩৫+৬০ = ২০০ টাকা জোগাড় করতে কষ্ট হয়। বর্তমানে অনেক উপজেলায় সরকারি নির্দেশনা তোয়াক্কা না করে বেশি টাকা নেয়া হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে দেশের চরম আর্থিক সংকটে এবং তারই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের গরিব মানুষের সন্তানদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা। পরীক্ষার সার্বিক নিয়ন্ত্রণ উপজেলা কর্মকর্তার অধীনে থাকায় সাধারণ মানুষের শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত করে দুর্নীতি প্রসারের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। বন্যাদুর্গত এলাকায় শিক্ষকদের আবেদন উপেক্ষা করে পরীক্ষার নামে বিশাল বাণিজ্য হচ্ছে। কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি স্কুলগুলোকে বাধ্যতামূলক মডেল টেস্টের আওতায় এনে কোনো কোনো উপজেলায় শুধু মডেল টেস্টের নামে ২ থেকে ৪ লাখ টাকা বাড়তি আদায় করা হয়েছে। প্রথম-দ্বিতীয় সাময়িক ও বার্ষিক পরীক্ষার টাকা শিক্ষকরা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দিলেও মডেল টেস্ট দুটির টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে নগদ গ্রহণ করছেন।

আগে থেকে এ দেশের মানুষ মুখস্থবিদ্যা পরীক্ষা দেখে ও দিয়ে অভ্যস্ত। শিশু শিক্ষার্থীর সার্বিক বিকাশে হঠাত্ করে বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতি বিলোপ করা হলে জনমনে ভ্রান্ত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। এ প্রেক্ষাপটে বইয়ের পড়া অংশে সার্বিক জ্ঞান অর্জন হলো কিনা, শিক্ষক প্রতিনিয়ত মূল্যায়ন করবেন। শ্রেণীর দুর্বল শিক্ষার্থীকে বিশেষ সুযোগ দিয়ে নিরাময়মূলক পাঠের ব্যবস্থা করবেন। শিক্ষার্থীর আচার-আচরণ, নৈতিক শিক্ষা, বলার দক্ষতা, সময়নিষ্ঠা শিক্ষাসহ একটি আদর্শ মূল্যায়ন পদ্ধতি গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতির আদলে বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। বেশির ভাগ মানুষ যখন আদর্শ মূল্যায়ন পদ্ধতির সুফল সম্পর্কে জানবে, তখনই পরীক্ষা পদ্ধতি বিলোপ সাধন করা যাবে। কিন্ডারগার্টেনগুলোয় কঠোরভাবে এ মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করতে হবে। পরীক্ষার সব দায়িত্ব থাকবে বিদ্যালয়ের ওপর, যাতে গরিব শিক্ষার্থীরা আর্থিক অনটনে পরীক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়। সমাপনী পরীক্ষার বিশাল কর্মযজ্ঞে শিক্ষার্থীর লেখাপড়া দারুণভাবে ব্যাহত হয়। এ প্রেক্ষাপটে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডকে সমাপনী পরীক্ষা গ্রহণের দায়িত্ব দিতে হবে। সমাপনী পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ হলেও নিজ নিজ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রে উত্তর বলে দেয়ার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জিপিএ ৫ বানানো যেন পরীক্ষকের কর্মে পরিণত হয়েছে। পরীক্ষকের এহেন অপকর্ম থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দিতে হবে। অনেক মেধাবী এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরীক্ষা পদ্ধতি আমূল পরিবর্তন করে আমাদের আগামী প্রজন্মকে নোট, গাইড, কোচিংমুক্ত জ্ঞাননির্ভর জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মন্ত্রণালয়কে পরীক্ষার বিশাল বাণিজ্যের দুর্নীতি থেকে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা রক্ষা করতে হবে।

লেখক: প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা ফোরাম

এই রকম আরও খবর দেখুন

সর্বশেষ আপডেট

অ্যার্কাইভ ক্যালেন্ডার
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১