বাবা, তুমি আছো অস্তিত্বজুড়ে-সাংবাদিক মিলন

বাবা, তুমি আছো অস্তিত্বজুড়ে-সাংবাদিক মিলননুরে ইসলাম মিলন : গতকাল ছিলো ২২জুন ২০২২ইং বুধবার আমার বাবা মরহুম মোস্তাক হোসেন ডাবলু’র ১৩তম মৃত্যু বার্ষিকী। ২০০৯ সালের ২২শে জুন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আমার বাবা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। সবার মতো আমাদের কাছেও বাবা ছিলেন আমাদের সুপার হিরো। তিনি ছিলেন আমাদের একজন ভালো বন্ধু এবং একজন ভালো গাইড। জীবনে চলার ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক এবং সব সময় অনুকরণীয় ব্যক্তি। সেই সুপার হিরোর মৃত্যু বার্ষিকীতে তাকে নিয়ে আমার কিছু কথা….

বাবা তুমি কোথায় আছ? কেমন আছ তুমি? শুনেছি মানুষ মারা গেলে আকাশের তারা হয়ে যায় কিন্তু তুমি-তো তারা হওনি। যদি তারা হতে তবুও তোমায় দেখতে পেতাম কিন্তু তোমাকে-তো আমি দেখতে পাইনা। বলতে পারিনা তোমার জন্য আমার বুকের গহীনটায় কেমন পুড়ে দিবারাত্রি। আচ্ছা, তুমি কি আমায় দেখতে পাও?

এই দিনে তুমি শুধু আমাদেরকেই নয় সমন্ত পৃথিবীকেই বিদায় জানিয়েছ। সকল মায়াজাল ছিন্ন করেছ। আচ্ছা সত্যিই কি তুমি আমাদের ছেড়ে যেতে চেয়েছিলে? মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও কি আমাদের চেহারা ভেসে উঠেছিল? তুমি মারা যাবার আগে কি যেন বলতে চেয়েছিলে বাবা? তা বুঝতে পারেনি। তখনও কি তুমি আমাদের নাম ধরে ডাকছিলে শেষ দেখা দেখার জন্য? মৃত্যু যন্ত্রনা কি খুব বেশি? খুব জানতে ইচ্ছা করে। তুমি সেদিন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলে তাই অনেক কিছুই দেখতে পাওনি।

২০০৯ সালের ২২ জুন ভোররাতে না ফেরার দেশে চলে গেলেন আমার বাবা। দেখতে দেখতে তেরটি বছর পেরিয়ে গেল । মাত্র ৪৮ বছর বয়সে হার্ট স্ট্রোক করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাবা আমাদের ছেড়ে চলে যান ।সেদিনেই বুঝেছি বাবাকে হারানোর শোকটা কতটা কষ্টের ।বিশ্বাস হচ্ছিল না আমার তুমি নেই । সেই সময়টা মনে পড়লে দমবন্ধ হয়ে আসে। বাবাকে হারিয়ে আমি পাথর হয়ে গেছিলাম।

আমার বাবা ২১ জুন ২০০৯ইং আমার বড় আব্বা (বড় চাচা)র ছেলের বৌভাত অনুষ্ঠান শেষে মিয়াপাড়াস্থ বাসা থেকে রানিবাজার এর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলেন। ঠিক রাত্রি আটটার সময় বাবার ফোন আমার শরীর খারাপ করছে তুমি রানিবাজারে এসো। বড়ভাই নুরে আলম সেন্টুকে ফোন করে বিষয়টি জানিয়ে দৌরে রানিবাজার পৌছিয়ে শুনি বাবা হার্ট স্ট্রোক করেছেন। বাবার বাল্য বন্ধু শরিফ চাচা বাবাকে অসুস্থ অবস্থায় বাসায় নিয়ে গেছে। বাসায় পৌছিয়ে আমি আমার মেজভাই নুরে আসলাম লিটন ও বড় ভাই নুরে আলম সেন্টু দ্রুত গাড়িতে নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে ৩২নং ওয়ার্ডে ভর্তি করলে চিকিৎসক ওয়ার্ডের আই.সি.ইউ ওয়ার্ডে ভর্তি করেন। সেখানে সারারাত আর বাবার সাথে কথা হয়নি। ভোর ৫টার সময় মা ও বড় ভায়ের কথায় বাসায় রেস্ট নিতে আসি । হটাৎ বড় ভায়ের ফোন বাবা আর নেই। মনে হলো পৃথীবিটা মাথার ওপড়ে ভেঙ্গে পড়লো। মারা যাওয়ার আগে বাবা বার বার ইশারা করে কি জেন বলছিলেন তা আজো বুঝে উঠতে পারিনি।

সেদিন অনুভব করেছিলাম ,মাথার উপর থেকে বট বৃক্ষের ছায়ার মতো এতোদিন যে মানুষটি আগলে রেখেছিল আকস্মিক আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

আমার বাবা জীবন চলার পথে সৎ ভাবে বেচে থাকার জন্য অনেক কিছুই করেছেন। কিন্তু কোন দিন অসৎ কোন কাজে জড়িত ছিলেন না। সদাহাস্যমুখ মিশুক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন আমার বাবা। কারো বিপদ আপদ শুনলেই যেন নিজের বিপদ ভেবে ঝাপিয়ে পড়তেন তার উপকারে। তাই এলাকার প্রত্যেকটি মানুষই তাকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করতেন।

স্বভাবগত গাম্ভীর্যের জন্য বাবার সাথে সবার ঘনিষ্ঠতা একটু কম থাকে। কিন্তু সে মানুষের আমাদের প্রতি ভালোবাসার কোন ঘাটতি ছিলো না।

একেকটা দিন বড় একা লাগে, বাবার স্পর্শটুকু, বাবার সেই মায়াভরা ডাক অথবা মাথায় হাত ভুলিয়ে দেয়া। বাবা থাকতে ভাবতাম, বাবা যদি না থাকেন, তবে আমি কিভাবে থাকবো ! বাবা নেই আজ ১৩ বছর, বাবাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো এ কখনো কল্পনা করিনি, কিন্তু বাস্তবতা বড়ই কঠিন। কেটে যাচ্ছে একেকটি দিন, মাস আর একেকটি বছর – বাবা নেই, আছে বাবার অনেকগুলো স্মৃতি, অনেকগুলো কথা, যা ভুলতে পারিনা, ভোলা যায়না।

বাবা, আজ তোমায় অনেক বেশি মনে পড়ছে। মনে পড়ছে পড়ালেখা রেখে খেলার জন্য যে মার দিতে, আদর করে যখন বাবা বলে ডাকতেন। তিনি কোথাও গেলে আমাকে নিয়ে যেতেন। বাবা তোমার হাতে অনেকদিন কোন মার খাইনা, খুব ইচ্ছা হচ্ছে মার খেতে।

জানি বাবা তুমি আর ফিরে আসবে না। অকারণে তবু কেন তোমাকে কাছে ডাকি। তুমি নেই আমাদের মাঝে অনুভব করতেই খুবই কষ্ট লাগে।

তেমার কথা গুলো মনে করলে লিখতে পারছিনা। লিখতে বসলেই অজস্র স্মৃতির ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছি আমি। মাথার ভিতর তোলপাড় করছে ঘটনা প্রবাহ। কোনটা ছেড়ে কোনটা লিখব ভেবে পাচ্ছিনা। তাই বোধহয় এই লেখাটিতে তোমায় কোন সম্ভাষণ জানাতে পারলাম না। কারণ, তোমাকে কোন সম্ভাষণে সম্ভাষিত করবো আমি বুঝতে পারছিনা। যাই করি না কেন তা তোমার জন্য অতি নগন্য হয়ে যাবে।
জানো বাবা, তোমাকে নিয়ে বেঁচে থাকতে এভাবে তো লিখিনি তাই হাতটা কাঁপছে। ঠিকমত লিখতে পারছিনা। লিখতে গিয়ে চোখ দিয়ে অশ্রু ঝড়ে পড়ছে মাটিতে।
এতদিন তোমাকে নিয়ে লিখিনি। কারণ আমি মনে করি আমার ভিতরেই তো বাবা আছে, আমিইতো বাবা। তাই বাবার কথা আলাদা করে লিখার কিংবা বলার দরকার পড়েনা। তবে জানো আজ তোমাকে নিয়ে খুব লিখতে ইচ্ছে করছে। প্রত্যেকটা সন্তানই বোধ হয় জীবনের একটা পর্যায়ে বাবাকে খুব মিস করে।
বাবার কথা খুব ভাবে। মনে হয় বাবা নামক সেই মানুষটা যদি এই মুহূর্তে আমার মাথায় তার অকৃত্রিম স্নেহের হাতটা বুলিয়ে দিতো সব সমস্যা যেন দূর হয়ে যেত। এখন আমি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছি বাবা। নিজের স্বপ্নের সাথে বাস্তবতার অনেক অমিল তা এখন বুঝতে পারছি। চারদিকে অজ মিথ্যার ভিড়ে একটা সত্যের পিছনে ছুটছি নিরন্তর। পৃথিবীতে এত মানুষ কিন্তু একজন মানুষই মিলেনা অকৃত্রিম ভালবাসা উপহার দেবার। আর ঠিক তক্ষুনি আমার মনে হয় তোমার কথা। অনেক আনন্দের মুহূর্তে যে মানুষটা অবিচল থেকে আমাকে স্মরণ করে দিয়েছে ভবিষ্যতের কথা। মাঝেমধ্যে তুমি যখন আমার উপর রেগে যেতে তখন বুঝতে পারতাম না বাবা, যে তোমার ঐ কঠিন মাথার ভিতরেও যে পরিমাণ ভালবাসা লুকায়িত ছিলো পৃথিবীর সমস্ত ভালোবাসা জড়ো করলেও তার সমতুল্য হতে পারেনা।
আজ বাবার সাথে পথ চলার সময় গুলকে অনুভব করছি, চলার জীবনে বাবার ছায়াতেই বড় হয়েছি, বাবার ভালোবাসা, বাবার স্নেহ, বাবার আদর আজও আমার স্মৃতিতে সতেজ হয়ে ভাসে। আমার বাবা ছিলেন আমার আর্দশ। আজ বাবাকে আমার খুব প্রয়োজন ছিলো বাবার সাথে আমার অনেক কথা বলার ছিলো আমি বলতে পারিনি তাই মনের লুকানো কথাগুলো আজও কারো সাথে ভাগাবাগি করতে পারিনি। বাবার আর্দশ, বাবার সততা, বাবার নৈতিকতা আমার কাছে অতুলনীয়। যাদের বাবা আছে তারা জানেনা বাবার ছায়াটা কতটা তার সন্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ । বাবাহীন পৃথিবীটা বেশ অদ্ভুত ! যাদের বাবা নেই তারা কেবল জানেন বাবার অনুপুস্থিতিটা কেমন । এক সময় বাবার বুদ্ধিছাড়া কোন কাজেই সফল হওয়া যেতো না, আর আজ বাবাকে ছাড়া চলতে হচ্ছে প্রতিটা মুহূর্ত । বুদ্ধিহীন অবস্থায় চলতে হচ্ছে এই অচেনা জীবন শহরতলীতে। কিন্তু বাবার সেই স্মৃতি বাবার সেই উপদেশমূলক কথাগুলো আজও আমার অন্তরকে গভীরভাবে নাড়া দিয়ে যায়! যার আদর্শ আমাকে মানুষ হতে সাহায্য করছে। সারা জীবন বাবাকে মিস করবো।। বাবার কথা মনে পরলে এখনো চোখে পানি চলে আসে।

‘হে আমাদের রব! যেদিন হিসাব কায়েম হবে, সেদিন আপনি আমাকে, আমার বাবা-মাকে ও মুমিনদেরকে ক্ষমা করে দেবেন।’
আল্লাহ আপনি আমারববাবাকে জান্নাত নসিব করুন।আমিন।

এই রকম আরও খবর দেখুন

সর্বশেষ আপডেট

অ্যার্কাইভ ক্যালেন্ডার
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০