ভয়ের রাজত্ব এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর

উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কাটছে পৌরবাসির দিন-রাত

উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কাটছে পৌরবাসির দিন-রাত

বিশেষ প্রতিনিধি : চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রতিদিনই ঘটছে নির্বাচনী সহিংসতা। চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কাটছে পৌরবাসির দিন-রাত। চাঁপাইনবাবগঞ্জে একচ্ছত্র আধিপত্য নেয়ার চেষ্টায় ভিন্নমত নিশ্চিহ্নের মিশনে নেমেছে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। হামলা, ভাংচুর চালিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে সন্ত্রাসী বাহিনীর উল্লাসনৃত্য। বসছে মদ-ফেনসিডিলের আসর। শহরজুড়ে এখন ভয়ের রাজত্ব। সরকারি দলের নেতা ও পুলিশের প্রশ্রয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ। ক্ষমতাসীন দলের মেয়র প্রার্থীর সরবরাহ করা তালিকা অনুযায়ী সন্ত্রাসীরা দলবদ্ধ হয়ে হামলা-ভাংচুর চালাচ্ছে।

জানা গেছে, দুটি সন্ত্রাসী গ্রুপ বিভক্ত হয়ে নির্বাচনী সহিংসতা চালিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এর একটি গ্রুপের নেতৃত্বে পৌর কৃষক লীগের সভাপতি মেসবাহুল হক টুটুল। অপর গ্রুপের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নেতা মোখলেসুর রহমানের ব্যক্তিগত গাড়িচালক বাক্কার। এই দুই গ্রুপেই রয়েছে পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীরা। মেসবাহুল হক টুটুল গ্রুপে রয়েছে নিতাই, বেলাল, কোয়েলসহ ১০-১২ জন ও বাক্কার গ্রুপে রয়েছে নাগর ও মিজান (বোমা মিজান)সহ ১২-১৪ জন। এরা সবাই ছিনতাই-বোমাবাজিসহ ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত। টাকা পেলে সব করতে পারে তারা। এদের সঙ্গে পাশের উপজেলা শিবগঞ্জ থেকে আসা কিছু অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীও যোগ দেয়। অংশ নেয় সহিংসতায়। আর্থিক যোগানও দিচ্ছেন মোখলেসুর রহমান।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোখলেসুর রহমান মাত্র দুই বছর আগে রাজনীতিতে জড়ান। আওয়ামী লীগের সদস্যপদ না থাকলেও হঠাৎ করে তিনি পৌর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মনোনীত হন। পরে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হয়েছেন। পৌর নির্বাচনের মনোনয়নও পেয়েছেন মোখলেসুর রহমান। এই মোখলেসুর রহমান পেশায় একজন ব্যবসায়ী। রয়েছে অটোরাইস মিল ও পরিবহন ব্যবসা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী মোখলেসুর রহমানের ছত্রছায়ায় তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক বাক্কার হঠাৎই সন্ত্রাসী হয়ে উঠেছেন। গড়ে তুলেছেন নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী। ব্যবসায়ী মোখলেসুর রহমান নৌকার মনোনয়ন পাওয়ার পর বাক্কার বাহিনী আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি মোখলেসুর রহমান কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির সদস্যসচিব মনোনীত হওয়ার পর লাগামহীন কর্মকাণ্ড শুরু করে তার পালিত সন্ত্রাসীরা।

শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে লোকজনের সঙ্গে কথা বলে বাক্কারের সন্ত্রাসের কথা শোনা গেলেও পরিচয় প্রকাশ করে তার সম্পর্কে কথা বলতে কেউ রাজি হননি। জমি দখল, চাঁদাবাজি আর মাদক কারবারের টাকায় বিলাসী জীবনযাপন করেন বাক্কার। একজন গাড়িচালকের লাইফস্টাইল শিল্পপতির জীবনযাপনকেও হার মানায়। তিনি অসংখ্য মানুষকে তুলে নিয়ে পিটিয়েছেন।
এলাকাবাসীর দাবি, বাক্কারের ভয়ে গোটা এলাকা তটস্থ। তার বাহিনীর বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যবস্থা না নেয়ায় সে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীর অফিস ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও তাদের কর্মীদের তুলে এনে নির্যাতন করে শহরজুড়ে একটি ভীতিকর অবস্থা তৈরি করেছে বাক্কার। ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত মেয়র প্রার্থীর প্রশ্রয়ে নানা অপকর্ম করে বেড়াচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গোপনে খবর নিলে আরও নির্যাতনের ঘটনা বেরিয়ে আসবে। এছাড়াও প্রতিদিন বটতলাহাটের জোসনারা ফাউন্ডেশনের অফিসে সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বসে মদের আসর।

বাক্কারের নির্যাতনের শিকার মিনাউর রহমান বলেন, ১২ সেপ্টেম্বর রাতে আমাকে তুলে নিয়ে গিয়ে বাক্কার বাহিনী বেধড়ক পিটিয়ে পা ভেঙে দেয় ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। এ ঘটনায় আমার মা আকলিমা বেগম বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন। কিন্তু পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করেনি। প্রকাশ্যে ঘুরলেও পুলিশ তাদের গ্রেফতার করছে না। উল্টো মামলা তুলে নিতে হুমকি দিচ্ছেন বাক্কার।

মিনাউরের মা আকলিমা খাতুন (৬০) অভিযোগ করে বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার বটতলাহাট এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা ও গ্রামীণ ট্রাভেলস পরিবহনের মালিক মোখলেসুর রহমানের লোকজন ১৩ সেপ্টেম্বর আমার ছেলেকে ডেকে নিয়ে হামলা করে আহত করে। ঘটনার পর মামলা করতে গেলে মোখলেসুর রহমানের নাম দিতে দেয়নি পুলিশ। তার নাম বাদ দিয়ে মামলা নিলেও কাউকে গ্রেফতার করেনি।

২ নভেম্বর রাতে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থীর জোসনারা ফাউন্ডেশন কার্যালয়ে তুলে নিয়ে সোহেল ও রিপন নামে দুই যুবককে বেধড়ক পিটিয়েছে বাক্কার বাহিনী। পিটিয়ে আহত করে সোহেলকে রাস্তার বিদ্যুৎতের পোলের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দিলে ঘটনাস্থল থেকে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সোহেল বলেন, মিনাউর রহমানকে মারধরের মামলায় শুধু সাক্ষী হওয়ার অপরাধে আমাকে পিটিয়ে আহত করেছে বাক্কার বাহিনী। আমি এখন স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছি না। এ ঘটনায় থানায় এজাহার দিলেও মামলা রেকর্ড হয়নি। আইনি কোন ব্যবস্থাও নেয়নি পুলিশ। ওসি মামলা না নিয়ে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দিয়েছেন বলেও জানান সোহেল।

এর আগে ২৫ অক্টোবর রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্বতন্ত্র প্রার্থী সামিউল হক লিটনের কর্মী জাহিদুল ইসলামকে মারধর করেছে বাক্কার বাহিনী।
জাহিদুল ইসলাম বলেন, বটতলাহাট এলাকার একটা চায়ের দোকানে বসেছিলাম। এ সময় আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী মোখলেসুর রহমানের ভাতিজা বাক্কার তাকে জোর করে জোসনারা ফাউন্ডেশনের অফিসে তুলে নিয়ে যায়। ওই অফিসে থাকা ১০-১২ জন মিলে তাকে ব্যাপক মারধর করে। এতে শরীরে বিভিন্ন স্থানে জখম ও নাক দিয়ে রক্ত ঝরে। তার দাবি স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় তাকে নির্মমভাবে পিটিয়েছে সন্ত্রাসী বাক্কার বাহিনী। এ ঘটনায় তিনি থানায় অভিযোগ করতেও সাহস পাননি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের শান্তিমোড়ের ‘বঙ্গবন্ধু’ ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক রনি বলেন, বাক্কার তার দলবল নিয়ে প্রতিনিয়ত আমাদের হুমকি দিচ্ছে। গতকাল সোমবার সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে নজিরবিহীন হামলা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী সামিউল হক লিটন। তিনি বলেন, নৌকার কর্মীরা নিজেদের নির্বাচনী প্রচারণার অফিসে ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ করে আমার কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হবে এমন পরিকল্পনাও করছেন। তাদের হামলা ভাংচুরে শহরজুড়ে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ নির্বাচনে যা হচ্ছে সে দৃশ্য সভ্য সমাজে কল্পনা করা কঠিন। এটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের ইতিহাসে নির্বাচনী সহিংসতার নিকৃষ্ট নজির। তার ছয়জন কর্মী ও ১৩টি নির্বাচনী ক্যাম্প ভাংচুর করের অভিযোগ করেন সামিউল হক লিটন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে কর্মীদের উপর হামলা, হুমকি ও নির্বাচনী ক্যাম্প ভাংচুরের প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলন থেকে ফেরার পথে হামলার শিকার হয়েছেন জুয়েল (৩৮)। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী সামিউল হক লিটনের কর্মী।

জুয়েল বলেন, সোমবার দুপুরে সামিউল হক লিটনের সংবাদ সম্মেলনে থেকে বাড়ি ফেরার পথে সন্ত্রাসীরা তার উপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন। এ সময় তার পকেটে থাকা টাকা ও মূল্যবান কাজগপত্র ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে বলে জানান।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে সোমবার বিকেলে ৫টি অবিস্ফোরিত ও তিনটি পরিত্যক্ত ককটেল উদ্ধারসহ দুজনকে গ্রেফতার করেছে সদর মডেল থানা পুলিশ। পৌর এলাকার আরামবাগের একটি গ্যারেজে তল্লাশি চালিয়ে ৫টি তাজা ককটেল ও নির্বাচন অফিসের পেছন থেকে ৩টি পরিত্যক্ত ককটেল উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি মোজাফফর হোসেন। তিনি বলেন, ককটেল উদ্ধারের বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এসব ককটেল ভোটের মাঠে আধিপত্য বিস্তারে ব্যবহার হতো বলে জানান তিনি।

এদিকে পৌর কৃষক লীগ সভাপতি তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেনÑ ‘নৌকায় উঠে পড়ুন, নয় তো বাড়িতে ঢুকে পড়ুন’। পৌরসভা নির্বাচনে উপলক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উদ্দেশ্যে ফেসবুকে এমন হুঁশিয়ারি দেন। স্ট্যাটাসটি মুঠোফোনে ছড়িয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন প্রার্থীরা।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শুধু প্রকাশ্যে এসেছে তা নয়, তারা আবারও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করেছে। ফলে শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার আশঙ্কা করছেন। ৩০ নভেম্বর চাঁপাইনবাগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এসব সন্ত্রাসীরা এলাকায় বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে।

অভিযোগের বিষয়ে পৌর কৃষক লীগের সভাপতি মেসবাহুল হক টুটুল বলেন,পুরো চাঁপাইনবাগঞ্জ পৌরসভা এখন সিসি ক্যামেরাই ঢাকা। কারা নির্বাচনী সহিংসতা,সন্ত্রসী ও নির্বাচনী ক্যাম্প ভাংচুর কর্মকান্ড করছে তা এই ক্যামেরাগুলো দেখলেই পেয়ে যাবেন। আমি কোন সহিংসতা ও সন্ত্রসী কর্মকান্ডের সাথে কোন ভাবেই জড়িত না বলে জানান তিনি।

 

এই রকম আরও খবর দেখুন

সর্বশেষ আপডেট

অ্যার্কাইভ ক্যালেন্ডার
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১