শিশুসাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিক জর্জ সন্ডার্সের বুকার জয়

উপচার ডেস্ক: ‘লিংকন ইন দ্য বার্ডো’ উপন্যাসের জন্য ২০১৭ সালের ম্যান বুকার পুরস্কার পেলেন আমেরিকার ছোটগল্পকার, শিশুসাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিক জর্জ সন্ডার্স। ‘লিংকন ইন দ্য বার্ডো’ তাঁর প্রথম উপন্যাস। ‘সিভিল ওয়ার ল্যান্ড ইন ব্যাড ডিক্লাইন’, ‘প্যাস্টরালিয়া’, ‘দ্য ভেরি পারসিস্টেন্ট গ্যাপারস অব ফ্রিপ’, ‘আ টু মিনিট নোট টু দ্য ফিউচার’ তাঁর ছোটগল্প ও উপন্যাসিকার অন্যতম। সন্ডার্সের জন্ম ১৯৫৮ সালে আমেরিকার টেক্সাসে। বড় হয়েছেন শিকাগোতে। সেরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জর্জ সন্ডার্স ন্যাশনাল ম্যাগাজিন পুরস্কার, ও’হেনরি পুরস্কার, পিইএন হেমিংওয়ে পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। ডাচেস অব কর্নওয়াল লন্ডনের গিল্ডহলে সন্ডার্সের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। সন্ডার্স বলেন, ‘আমাকে এই মহান পুরস্কারে সম্মানিত করার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। আমি কাজের মধ্য দিয়ে সামনের দিনগুলোতে এই পুরস্কারের মান ধরে রাখার চেষ্টা করব। ’ এ উপন্যাস লেখার সময় তাঁর মনের ওপর কেমন প্রভাব পড়েছিল—এমন বিষয় উল্লেখ করে তিনি জানান, উপন্যাসের এক-তৃতীয়াংশ লেখার পর তাঁর ওপরে খামখেয়ালি ভর করে। তাঁর মনে হতে থাকে, এই লেখা আদৌ কেউ পড়তে পারবে কি না। এরপর স্ত্রীর কাছ থেকে ইতিবাচক মন্তব্য পান। তখন আবার লেখার মেজাজ ফিরে পান সন্ডার্স। বুকার পুরস্কার গ্রহণ উপলক্ষে দেওয়া বক্তব্যে সন্ডার্স বলেন, “আমরা একটা অদ্ভুত সময়ে বাস করছি। জগতের কেন্দ্রে অবস্থিত প্রশ্নটা আসলে খুব সাধারণ। ভীতির প্রতি আমরা কি প্রতিক্রিয়া দেখাব বর্জন, নেতিবাচক প্রক্ষেপণ এবং প্রচণ্ডতা নিয়ে? নাকি বিশ্বাসের প্রাচীন অগ্রগতি এবং ভালোবাসা নিয়ে আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাব? আমরা যা কিছু ‘অন্য’ বলে দেখি, তা আসলে আমাদেরই আরেক রূপ—এ রকম বিশ্বাস নিয়ে আমরা অন্যভাবেও চেষ্টা করতে পারি। ” সন্ডার্স বলেন, এ উপন্যাসটি লেখা শুরু করার আগে তাঁর হূদয়ে বয়ে বেড়িয়েছেন দীর্ঘ ২০ বছর। তিনি বলেন, ‘আমার গল্প খানিকটা নেতিবাচক, নৈরাশ্যজনক এবং স্বভাবে কল্পবৈজ্ঞানিক। এ জন্য এসব উপাদান নিয়ে কেমন করে এগোব বুঝতে পারছিলাম না। বার দুয়েক চেষ্টা করে দেখলাম, হচ্ছে না। কাজেই ভাবলাম—হয় ছেড়েই দাও, নয়তো যখন ঠিকমতো লেখার শক্তি হবে তখন লেখা যাবে। ’ ২০১৭ সালের বিচারকদের প্যানেলের প্রধান লোলা ইয়াং সন্ডার্সের এ উপন্যাস সম্পর্কে বলেন, উপন্যাসটি ‘রসিক, বুদ্ধিদীপ্ত এবং গভীর আবেগী আখ্যান তুলে ধরেছে’। জর্জ সন্ডার্সের উপন্যাস অন্য যেসব উপন্যাসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে টিকেছে সেগুলো হলো তাঁর স্বদেশি পল অস্টারের ‘৪৩২১’, আলি স্মিথের ‘অটাম’, মহসিন হামিদের ‘এক্সিট ওয়েস্ট’, এমিলি ফ্রিডলান্ডের ‘হিস্ট্রি অব উলভস’ এবং ফিওনা মোজলের ‘এলমেট’। সন্ডার্সের ‘লিংকন ইন দ্য বার্ডো’ উপন্যাসের কাহিনি তৈরি হয়েছে ইতিহাসের বাস্তব ঘটনার ওপরে। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের ছেলে উইলিয়াম ওয়ালেস লিংকন বা উইলি লিংকনের মৃত্যু এবং মৃত্যু-পরবর্তী ঘটনা এসেছে এ উপন্যাসে। ১৮৬২ সালে টাইফয়েডে মারা যায় ১১ বছরের উইলি। তিব্বতীয় বৌদ্ধ-বিশ্বাস অনুযায়ী বার্ডো মানে জীবন এবং পারলৌকিক জীবনের মাঝামাঝি সময়। উইলির মৃত্যুর আগে তার চিকিত্সকের বিশ্বাস ছিল, উইলির সামান্য ঠাণ্ডা লেগেছে এবং শিগগিরই সেরে উঠবে। তাঁর কথামতোই এক সন্ধ্যায় আব্রাহাম লিংকন ও মেরি টোড লিংকন হোয়াইট হাউসে তাঁদের পরিকল্পিত ডিনারে যোগ দিতে যান। টাইফয়েডে আক্রান্ত উইলি বিছানায় পড়ে থাকে। ওই রাতের পর আর বেশিদিন বাঁচেনি উইলি। জীবন ও পারলৌকিক জীবনের মধ্যবর্তী সময়ের অন্য দুজন প্রতিনিধি হ্যানস ভলমান ও রজার বেভিনস মৃত্যুর পরে উইলি লিংকনকে তাদের জগতে স্বাগত জানায়। ওখানে উইলির সঙ্গে যাদের দেখা হয়, সবাই মৃত এবং তাদের সবাইকে উইলির ওই কবরস্থানেই দাফন করা হয়েছে। মৃত হলেও তারা ওই কবরস্থানের চারপাশের চিত্র দেখতে পারে। তাদের বিশ্বাস, তারা মৃত নয়, তাদের অসুখ হয়েছে। ভলমান ও বেভিনস উইলিকে পারলৌকিক জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ের দিকে যেতে উত্সাহ দেয়। কারণ তাদের বিশ্বাস হলো, অল্পবয়সীদের জন্য বার্ডোকালীন অবস্থাটা বিপজ্জনক। তাদের চেনাজানা এলিসে ট্রেনর নামের অল্পবয়সী একটি মেয়ে দীর্ঘ সময় বার্ডোতে থাকার কারণে আর বের হতে পারেনি। ওখানেই চিরতরে বন্দি হয়ে যায় ট্রেনর। তবে উইলি পরবর্তী জীবনের দিকে চলে যাওয়ার আগেই তার বাবা আব্রাহাম লিংকন কবরস্থানে আসেন এবং সমাধিতে রাখা তার মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ওখান থেকে চলে যাওয়ার আগে আব্রাহাম লিংকন ছেলের মৃতদেহের সঙ্গে কথা বলেন এবং মৃতদেহটাকে আলিঙ্গন করেন। আব্রাহাম লিংকনের এ আচরণ দেখে উইলি এবং অন্য মৃতরা মনে করে, উইলি হয়তো তার আগের জীবনে ফিরে যেতে পারবে। অন্য মৃতরা উইলিকে তাদের জীবনের কথা বলে এবং আশা করে, উইলি এখান থেকে বের হওয়ার পর তাদেরও বের করে নিয়ে যেতে পারবে। উইলির ওখান থেকে ফিরে যাওয়ার সময় আব্রাহাম লিংকনের মনে পড়ে যায়, তিনি সমাধির মুখ বন্ধ করে আসেননি। তিনি ফিরে আসার পর ভলমান ও বেভিনস চেষ্টা করে উইলিকে বোঝাতে, যাতে সে তার বাবার সত্তার সঙ্গে মিশে যায় কিংবা কমপক্ষে পারলৌকিক জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ের দিকে যেতে পারে। এদিকে ভলমান ও বেভিনস সমাধি থেকে দূরে থাকার কারণে ইতিমধ্যে উইলি আরেকজন মৃতের সঙ্গে কথা বলে। তার নাম রেভারেন্ড এভারলি টমাস। টমাসই শুধু বিশ্বাস করে সে মৃত। তার আরো বিশ্বাস থাকে, সে একটা পাপ করেছে জীবনে এবং সেই পাপের বিচার হওয়ার পরই কেবল পারলৌকিক জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারবে। সে জন্যই সে বার্ডোতে বন্দি হয়ে আছে। আব্রাহাম লিংকন ফিরে আসার পর উইলি তার সত্তায় মিশে যাওয়ার চেষ্টা করলে এক ধরনের লতানো আঁকশি তাকে পেঁচিয়ে ধরে। এই লতানো আঁকশিগুলো আসলে অন্য মৃত ব্যক্তিদের আত্মা। উইলিকে আঁকড়ে ধরার সময় তারা নিজেদের পাপের কথা বলতে থাকে। তাদের কথা শুনতে পেয়ে রেভারেন্ড এভারলি টমাস আরো দৃঢ়তার সঙ্গে নিশ্চিত হতে পারে তার মরণশীলতা সম্পর্কে। টমাস তখন লতানো আঁকশিগুলোকে কৌশলে উইলিকে একমুহূর্তের জন্য ছেড়ে দিতে বলে এবং উইলিকে আঁকড়ে ধরে দৌড়ে নিরাপদে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে। তবে তারা আর বেশিদূর যেতে পারে না। আঁকশিগুলো তাদের পেঁচিয়ে ধরে এবং তারা পড়ে যায়। এরপর টমাস মাফ পায় এবং পরবর্তী অধ্যায়ে প্রবেশের অধিকার পায়। ভলমান উইলিকে নিয়ে আসে কবরস্থানের পাশের গির্জায়। সেখানে বসে আছেন আব্রাহাম লিংকন। উইলি তার বাবার সত্তায় মিশে যায়। মিশে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারে, সে আসলে মৃত। তার এই উপলব্ধির কথা অন্য মৃতদের ঘোষণা করে জানিয়ে দেয় এবং পরবর্তী অধ্যায়ের দিকে চলে যায়। আব্রাহাম লিংকনও ছেলের শোক কাটিয়ে উঠতে পারেন। উইলির ঘোষণা শুনে অন্য মৃতরাও মৃত অবস্থার কথা মেনে নেয় এবং পারলৌকিক জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ের দিকে যাত্রা করে। তাদের মধ্যে ভলমান ও বেভিনসও আছে। উল্লেখ্য, এবারের সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন অনেক বিখ্যাত লেখক ও বই। তাঁদের মধ্যে সেবাস্টিয়ান ব্যারির ‘ডেইজ উইদাউট এন্ড’, অরুন্ধতী রায়ের ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’, জ্যাডি স্মিথের ‘সুইং টাইম’ এবং কলসন হোয়াইটহেডের ‘দি আন্ডারগ্রাউন্ড রেইলরোড’।

এই রকম আরও খবর দেখুন

সর্বশেষ আপডেট

অ্যার্কাইভ ক্যালেন্ডার
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১