শিশু শরণার্থী সীমাহীন বেদনার মহাকাব্য

শিশু অধিকার রক্ষায় ১৯৮৯ সালে নভেম্বরে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে সবার মতামতের ভিত্তিতে ‘জাতিসঙ্ঘ শিশু অধিকার সনদ’ পাস করা হয়। এরপর ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বরে এটি আন্তর্জাতিক আইনের একটি অংশে পরিণত হয়েছে। ইতিহাসে এটি হচ্ছে সবচেয়ে ব্যাপকভাবে গৃহীত মানবাধিকার চুক্তি। জাতিসঙ্ঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৯১টি দেশ চুক্তিটি অনুমোদন করেছে। শিশু অধিকার সনদের ৫৪টি ধারায় শিশু কল্যাণ নিশ্চিত করাসহ সব ধরনের শোষণ, বৈষম্য, অবহেলা এবং নির্যাতন থেকে তাদের রক্ষার বিবরণ রয়েছে। সনদে স্বীকৃত অধিকারের আওতায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিশু ও মা-বাবা সম্পর্কে, সাংস্কৃতিক কর্মকা-, নাগরিক অধিকার, শিশুশোষণ এ আইনের সাথে বিরোধ জড়িত শিশুসহ অনেক বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু আজকে আমরা কী দেখছি? শিশুদের প্রতি অমানবিক জুলুম-নির্যাতনের মহোৎসব চলছে চার দিকে। সব আক্রোশ যেন শিশুদের ওপরেই। যুদ্ধ-সঙ্ঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। পৃথিবীর নানা প্রান্তে শরণার্থী শিশুদের ঢল নেমেছে। বিশেষ করে মুসলিম শিশুরা অমানবিক নির্যাতনের বেশি শিকার। আগ্রাসন আর যুদ্ধের ফলে ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ শিশু আজ উদ্বাস্তু। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অসংখ্য শরণার্থী শিশুর সলিলসমাধি ঘটেছে। সাগরের সৈকতে ভেসে ওঠা শিশু আয়লানের লাশ সাগরে বহু শিশুর মৃত্যুর সাক্ষ্য দিয়ে গেছে। শিশুদের ওপর নির্যাতন আর শিশু অধিকার লঙ্ঘনের সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে, রোহিঙ্গা শিশুরা। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর মিয়ানমার সরকার, সেনাবাহিনী আর উগ্রবাদী বৌদ্ধদের জুলুম-নির্যাতন ও গণহত্যার কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। গত এক মাসে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী জীবন বাঁচাতে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, যার বেশির ভাগ নারী ও শিশু। পালিয়ে আসার সময় নাফ নদীতে ২৩টি নৌকাডুবির মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। এতে ১১০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫৭ শিশু, ৩০ নারী ও ২৩ জন পুরুষ। অনেক লাশ ভেসে গেছে সাগরে। রোহিঙ্গারা যাতে আর মিয়ানমারে ফিরে যেতে না পারে সে জন্য সীমান্তে স্থলমাইন পেতে রাখা হয়েছে। মিয়ানমারে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ গত ২৮ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের ইনানি সমুদ্রসৈকতে রোহিঙ্গাবোঝাই তিনটি নৌকাডুবির ঘটনায় দুই দিনে সৈকত থেকে ২০টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২টি শিশু ও আট নারীর লাশ রয়েছে। বাংলাদেশে আসা শরণার্থীদের অর্ধেকই শিশু। তার মানে আড়াই লাখের বেশি শিশু আছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে। আর এসব শিশুর মধ্যে অন্তত ১৩০০ শিশু রয়েছে, যাদের বাবা, মা অথবা কেউ নেই। সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের প্রধান মার্ক পিয়ার্স বলেছেন, যদি এভাবে শরণার্থীরা বাংলাদেশে আসতে থাকে তাহলে বছরের শেষ নাগাদ ছয় লাখ শিশুসহ শরণার্থীদের সংখ্যা দাঁড়াবে ১০ লাখ। শরণার্থী শিশুদের মধ্যে রয়েছে হাজার হাজার নবজাতক। দুই সপ্তাহে নো ম্যানস ল্যান্ডেই প্রায় ৪০০ শিশুর জন্ম হয়েছে। লাখো মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে শিশুরা। সন্তানহারা বাবা-মা আর নিজেদের ঠিকানা না জানা শিশুদের সময় কাটছে অশ্রু বিসর্জন করে। আশ্রয়, খাদ্য ও পানির সঙ্কট, রোগব্যাধিতে মৃত্যুর আশঙ্কায় প্রহর গুনছে অনেকে। তবে বাংলাদেশ সরকার, জনগণ এবং ত্রাণ সংস্থাগুলো ক্যাম্প ও আশপাশ, সড়ক এবং পাহাড়ে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের মানিয়ে নিতে অনবরত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রের হাজার হাজার রোহিঙ্গা সর্দি, জ্বর, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। জাতিসঙ্ঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফের) শিশু সুরক্ষা প্রধান জ্যঁ লিবে আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে বলেছেন, অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগ শিশু এবং তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। গত কয়েক দিনে আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, এসব শিশু ব্যাপকভাবে ডায়রিয়া, সর্দি ও জ্বরসহ পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গা শিশুদের মধ্যে প্রায় শতকরা ৮৫ জনই রোগে আক্রান্ত। নেতিয়ে পড়ছে ফুলের মতো কোমল শিশুরা। প্রচ- ঝড়ে গৃহহারা, দিকহারা পাখির মতো আর্তনাদে মা ছটফট করছে, আর অন্য দিকে অবসন্ন কচি শিশুরা গুনছে মৃত্যুর প্রহর। নৃশংস প্রতিহিংসার শিকার হয়ে অকালেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে বহু শিশু। প্রকৃতির নিয়ম হচ্ছেÑ প্রতিকূলতার মধ্যেও শিশুদের নিরাপত্তার বিধান করতে হবেই। তাইতো আল্লাহ তায়ালা সব মা-বাবার মধ্যেই সন্তানের জন্য অকৃত্রিম ও অশেষ ভালোবাসা দিয়েছেন। প্রচ- ঝড়ের মধ্যেও পাখি বাসা ছেড়ে যায় না। প্রচ- প্রতিকূলতার মাঝেও ছানা নিয়ে পাখিরা বাসায় আঁকড়ে থাকে। প্রচ- কালবৈশাখীর ছোবলের চেয়েও কঠিন আক্রমণ অথবা জুলুম হলে, নিজের ও ছানার জীবন যখন নিশ্চিত হুমকির মুখে পড়ে, তখনই আশ্রয়স্থল ছেড়ে যেতে বাধ্য হয় পাখি। হুমকির মুখে শাবক বা সন্তানকে যখন তার মা-বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয় অথবা বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়; তখন ঘরহারা পাখি অথবা ভিটেছাড়া পরিবারের মধ্যে যে বেদনার উদ্রেক হয়, তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। উদ্বাস্তু প্রাণী বা মানুষগুলো হয়ে যায় চলমান লাশ। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দিকে তাকালে জীবন্ত লাশের মিছিলের ছবিই যেন ভেসে ওঠে।

এই রকম আরও খবর দেখুন

সর্বশেষ আপডেট

অ্যার্কাইভ ক্যালেন্ডার
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১