শেখ মুজিব, মোনেম খাঁ ও জেনারেলগণ

উপচার ডেস্ক: উনিশ শ আটষট্টি সালের ১৭ জানুয়ারির রাত। জেলখানার ছোট্ট রুমে শুয়ে আছেন শেখ মুজিব।তাঁর ঘুম আসছে না। তিনি বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছেন। বড় ধরনের দুশ্চিন্তা তাঁর মাথায় ভর করেছে। হঠাত্ এমন লাগছে কেন তাও বুঝতে পারছেন না তিনি। তাঁর পাশের বেডে আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আবদুল মোমিন অ্যাডভোকেট নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন। ১৭ মাস একাকী থাকার পর তাঁর রুমে আবদুল মোমিনকে আনা হয়। তিনিও নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার আছেন।

রাতে হঠাত্ জানালা দিয়ে কেউ একজন শেখ মুজিবকে ডাকছিলেন। ডাক শুনে তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে ভাবেন, এত রাতে কে ডাকছে! বিছানা থেকে উঠে তিনি জানালা দিয়ে তাকালেন।
দেখেন, ডেপুটি জেলার তোজাম্মেল সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। শেখ মুজিব বিস্ময়ের সুরেই বললেন, এত রাতে! কী ব্যাপার তোজাম্মেল সাহেব!

তোজাম্মেল সাহেব বললেন, দরজা খোলেন। ভেতরে এসে বলব।

শেখ মুজিব দরজা খুলে দিলেন। ডেপুটি জেলার রুমের ভেতরে এসে বললেন, আপনার জন্য সুখবর আছে।

শেখ মুজিব বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, মানে!

ডেপুটি জেলার বললেন, আপনাকে সরকার মুক্তির আদেশ দিয়েছে। এখনই আপনাকে মুক্তি দিতে হবে।

শেখ মুজিব ঠিক বিশ্বাস করতে পারলেন না। হঠাত্ কেন মুক্তি দেবে সরকার? এতগুলো মামলা ঝুলছে। কোনো মামলারই কোনো নিষ্পত্তি হয়নি। আরো মামলার পাঁয়তারা চলছে। মুক্তি দেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।

মোমিন সাহেবের ঘুম ভেঙে গেছে। তিনি বিছানা থেকে উঠে বসে আছেন। শেখ মুজিব আর ডেপুটি জেলারের কথা শুনছেন। কিছু বলবেন কি না বুঝতে পারছেন না। তবে তিনি মনে মনে বলেন, সরকার মুজিব ভাইকে ছেড়ে দেবে! এটাও বিশ্বাস করতে হবে! না না, এটা হতে পারে না।

ডেপুটি জেলার বললেন, সত্যি বলছি। আমাকে বিশ্বাস করেন। আপনাকে এখনই মুক্তি দিতে হবে। আপনার কাপড়চোপড় গুছিয়ে স্যুটকেসে ভরে চলুন। এখনই বের হতে হবে।

শেখ মুজিব বললেন, আমার বিরুদ্ধে এতগুলো মামলা। সেগুলোর কী হবে? চট্টগ্রাম থেকে কাস্টডি ওয়ারেন্ট রয়েছে। যশোর, সিলেট, নোয়াখালী, পাবনা থেকে প্রডাকশন ওয়ারেন্ট রয়েছে। ছাড়বেন কী করে? এটা তো বেআইনি হবে।

ডেপুটি জেলার বললেন, সরকারের হুকুম। এগুলো থাকলেও ছাড়তে পারি।

শেখ মুজিব বললেন, ঠিক আছে, সরকারের হুকুমনামা দেখান।

ডেপুটি জেলার নিরুপায় হয়ে সরকারের হুকুমনামা আনার জন্য জেলগেটে গেলেন। শেখ মুজিব মোমিন সাহেবকে বললেন, আমার মনে হয় এর ভেতর কোনো ষড়যন্ত্র আছে। অন্য জেলেও পাঠানো হতে পারে। তবে আমার সন্দেহ হচ্ছে। কিছুদিন ধরে আমার কানে আসছিল, আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। রেণুও আমার সঙ্গে দেখা করে বলেছিল। কোনো একটা মহল ষড়যন্ত্র মামলায় আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। পত্রিকায় দেখলাম, কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে ২৮ জনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র মামলা করেছে। সেখানে আমার নাম নেই। এত মাস ধরে জেলে। বাইরে যাওয়ারই তো সুযোগ পেলাম না। ষড়যন্ত্র করব কিভাবে? আমার নাম দিলে তো মামলা টিকবে না। এত বড় মিথ্যাচার তো আল্লাহও সইব না। এসব চিন্তা করেই হয়তো আমার নাম বাদ দিয়েছে। জানি না, সরকার কোন খেলা শুরু করেছে!

রাত ১২টার দিকে ডেপুটি জেলার আবার শেখ মুজিবের কাছে এলেন। তিনি তাঁকে সরকারের হুকুমনামা দেখালেন। শেখ মুজিব পড়ে দেখলেন, তাঁকে দেশরক্ষা আইন থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাঁর মনের মধ্যে সংশয় রয়েই গেছে। তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না যে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তাঁকে হয়তো অন্য কোথাও নিয়ে যাচ্ছে। তিনি মোমিন সাহেবকে বললেন, রেণুকে খবরটা দিয়েন।

মোমিন সাহেব প্রথমে খুশিই হয়েছিলেন। শেখ মুজিব মুক্তি পেলে তাঁরাও মুক্তি পাবেন—এমন একটা ধারণা ছিল তাঁর। কিন্তু পরে যখন বুঝতে পারলেন আসলে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে না, তখন তাঁর খুব মন খারাপ হলো। শেখ মুজিব তাঁর কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় শুধু বললেন, আপনাদের সঙ্গে আর বোধ হয় দেখা হবে না। আপনারা রইলেন এ দেশের মানুষের জন্য। আমি চললাম। খোদা আপনাদের সহায় আছেন। আর আমার বইপত্র ও অন্য জিনিসপত্র নিলাম না। কামালকে (বড় ছেলে) খবর দেবেন। ও নিয়ে যাবে।

ডেপুটি জেলার, জমাদার সবার মুখই ভার। কারো মুখে কোনো হাসি নেই। কেউ তেমন কোনো কথাও বলেন না। তাঁদের মুখ দেখে শেখ মুজিব ভালোভাবেই বুঝতে পারলেন, নতুন করে তাঁকে বিপদের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তিনি এবার নিশ্চিত হয়েছেন যে তাঁকে ষড়যন্ত্র মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।

শেখ মুজিব সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাত ১টার দিকে জেলগেটে গিয়ে হাজির হলেন। সেখানে গিয়ে দেখেন এলাহি কাণ্ড। সামরিক বাহিনীর বিপুলসংখ্যক লোক সামরিক পোশাকে দাঁড়িয়ে আছেন। এরপর তাঁর আর কোনো সন্দেহ রইল না। তিনি নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে তাঁকে ব্যারাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

শেখ মুজিব ডেপুটি জেলারের রুমে গিয়ে বসতেই একজন সামরিক বাহিনীর বড় কর্মকর্তা তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, শেখ সাহেব, আপনাকে গ্রেপ্তার করা হলো।

শেখ মুজিব বললেন, নিশ্চয়ই আপনার কাছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে? আমাকে দেখালে বাধিত হব।

সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা সাদা পোশাকের এক কর্মচারীকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পড়ে শোনাতে বললেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আদেশটি পড়লেন। তাতে লেখা আছে, আর্মি, নেভি ও এয়ারফোর্স আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তার করা হলো।

আদেশ শোনার পর শেখ মুজিব বললেন, ঠিক আছে, চলুন কোথায় যেতে হবে? আরেকটা কথা, আপনারা কিন্তু আমাকে লিখিত আদেশ দিলেন না!

এ সময় একজন সেনা কর্মকর্তা শেখ মুজিবের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললেন, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আপনি যেখানে থাকবেন, সেখানে আপনার মালপত্র পৌঁছে যাবে।

ঢাকা জেলের জেলার ফরিদ আহম্মদ হাসতে হাসতে বললেন, আমরা তো আপনাকে ছাইড়া দিলাম।

কথাটা শুনে শেখ মুজিবের মেজাজ চড়ে যায়। তিনি তাঁকে কঠিন জবাব দেওয়ার কথা ভাবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে বললেন, বাজে কথার দরকার নেই।

জেলগেটের সামনেই সেনাবাহিনীর গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা পাহারারত। সান্ধ্য আইনের মতো পরিবেশ। লোহার গেট খুলে দেওয়া মাত্র একজন মেজর শেখ মুজিবকে গাড়িতে উঠতে বললেন। শেখ মুজিব এক পা-দুপা করে এগিয়ে গেলেন। গাড়িতে উঠলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দুই পাশে দুজন সশস্ত্র সেনা সদস্য বসলেন। সামনের সিটে ড্রাইভার ও মেজর সাহেব বসলেন। নাজিমউদ্দিন রোড থেকে গাড়ি রমনার দিকে ছুটে চলল।

শীতের রাত। গাড়ির দুই পাশের গ্লাস খোলা। হু হু করে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছে। কিন্তু বাতাসটা যেন শেখ মুজিবের দুঃখ-ভারাক্রান্ত মনে স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে দিয়েছে। তিনি পাইপ ধরালেন। পরপর কয়েকটা টান দেওয়ার পর তৃপ্তির সঙ্গে ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর বাইরের দিকে তাকালেন। অনেক দিন পর ঢাকা শহরের আলো-আঁধারি চেহারা দেখতে পান তিনি। মনে মনে তিনি শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমউদ্দিনের কবরকে সালাম করেন। গাড়ি ইউনিভার্সিটি, শাহবাগ হয়ে এগিয়ে চলছে কুর্মিটোলার দিকে।

গাড়ি এয়ারপোর্ট পার হয়ে যখন ক্যান্টনমেন্টের দিকে ঢুকল, তখনই শেখ মুজিব পুরোপুরি বুঝে গেলেন, তাঁকে কোথায় নেওয়া হচ্ছে। তিনি মনে মনে বাংলার মাটিকে বললেন, আমি তোমায় ভালোবাসি। মৃত্যুর পর তোমার মাটিতে আমার যেন একটু স্থান হয় মা!

তারপর রবীন্দ্রসংগীতের সেই লাইনগুলো তাঁর মনে পড়ল।

ও আমার দেশের মাটি

তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা।

তোমাতে বিশ্বময়ীর…

তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা।

তুমি মিশেছ মোর দেহের সনে

তুমি মিলেছ মোর প্রাণে মনে

তোমার ওই শ্যামল বরণ

কোমল মূর্তি মর্মে গাঁথা।

ওগো মা, তোমার কোলে

জনম আমার, মরণ তোমার বুকে

তোমার ’পরে খেলা আমার দুঃখে-সুখে।

তুমি অন্ন মুখে তুলে দিলে,

তুমি শীতল জলে জুড়াইলে

তুমি যে সকল-সহা

সকল-বহা মাতার মাতা। ….

কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ঘরের সামনে গিয়ে গাড়ি থামল। শেখ মুজিব গাড়ি থেকে নামলেন। চারদিকে তাকালেন। এখানেও সেনা সদস্যদের সশস্ত্র পাহারা দেখা গেল। মেজর সাহেব তাঁকে একটি কক্ষে নিয়ে গেলেন। এখানে তিনজন সাদা পোশাকের কর্মচারী দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁরা কোনো কথা বললেন না। শেখ মুজিবও কিছু বললেন না। দাঁড়িয়ে রইলেন। পরে বললেন, আমার শরীর ভালো না। কোথাও বসার অনুমতি দেন।

শেখ মুজিবকে আরেকটি কক্ষে নিয়ে বসতে দেওয়া হলো। এর কিছুক্ষণ পরই এক ভদ্রলোক এসে ষড়যন্ত্রের ব্যাপার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন।

শেখ মুজিব বললেন, কিছুই জানি না।

এক কামরাবিশিষ্ট একটি দালান। সঙ্গে গোসলখানা, ড্রেসিংরুম ও স্টোররুম আছে। দুটি খাট পাশাপাশি। একটি খাটে বিছানা পাতা। অন্যটি খালি পড়ে আছে। এই কক্ষেই শেখ মুজিবের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জেলখানা থেকে ব্যবহারিক জিনিসপত্র এখানে আনা হয়েছে। একজন সৈনিক মালপত্র নিয়ে এসে বললেন, আপনার মালপত্র এসে গেছে। দয়া করে দেখে নিন।

শেখ মুজিব মালপত্র দেখে খাটের ওপর গিয়ে বসলেন। এ সময় লেফটেন্যান্ট জাফর ইকবাল রুমে ঢুকে নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, আমি আপনার পাশের খাটেই থাকব।

খাকি পোশাক পরা লোকটির কোমরে পিস্তল দেখা যাচ্ছে। তিনি আর কথা বাড়ালেন না। একাকী প্যাসেন্স লিখতে লাগলেন। আর শেখ মুজিব খাটে বসে পাইপ টানতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পর সাদা পোশাক পরিহিত দুজন সেনা কর্মকর্তা এলেন। একজন বললেন, কোনো অসুবিধা আছে?

শেখ মুজিব মাথা নেড়ে না-সূচক জবাব দিলেন।

আরেকজন কর্মকর্তা বললেন, আপাতত এখানেই আপনাকে থাকতে হবে। চা খাবেন?

শেখ মুজিব বললেন, খেতে পারি। ঘুমের রেশ কাটানোর জন্য হলেও চা খাওয়া দরকার।

তা ঠিক। আপনার ঘুম হয়নি। হওয়ার কথাও না। আমরা তো মাঝরাতে আপনাকে নিয়ে এলাম।

এর মধ্যেই চা এসে গেল। তিনজন একসঙ্গে চা নিলেন। শেখ মুজিব চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, আমাকে কেন আপনারা নিয়ে এসেছেন জানি না। তবে সত্য চাপা থাকবে না। অন্যায়ভাবে আমার ওপর অত্যাচার করে কী লাভ হবে বুঝতে পারছি না।

একজন টিপ্পনী কেটে বললেন, আমরা তো শুনলাম ষড়যন্ত্রের সঙ্গে আপনার স্ত্রীও জড়িত!

শেখ মুজিব বললেন, দেখুন, আমার স্ত্রী রাজনীতির ধার ধারে না। আমার সঙ্গে পার্টিতে কোনো দিন যায় নাই। সে তার সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বাইরের লোকের সঙ্গে মেলামেশাও করে না। আমার রাজনীতির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নাই।

কথা না বাড়ানোর জন্য অপর কর্মকর্তা ইশারা করলেন। তারপর তিনি শেখ মুজিবকে উদ্দেশ করে বললেন, আপনার থাকা-খাওয়ার কোনো অসুবিধা হলে জানাবেন। আমরা গেলাম।

দুই কর্মকর্তা চলে যাওয়ার পর শেখ মুজিব শুয়ে পড়লেন।

২.

শেখ মুজিবকে কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ক্যান্টনমেন্টে নেওয়া হয়েছে কি না তা জানার জন্য ভোর থেকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন ইয়াহিয়া খান। সকালে আলো ফুটতে না-ফুটতেই ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে শেখ মুজিবের গ্রেপ্তারের খবর তাঁকে জানানো হলো। তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন। তারপর গাড়ি নিয়ে ছুটলেন প্রেসিডেন্ট সাহেবের বাসভবনের দিকে। তাঁর মনের মধ্যে আনন্দের ঢেউ খেলছে। তিনি যেন বিরাট বিজয় লাভ করেছেন। শেখ মুজিবকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অজ্ঞাত স্থানে রাখা হয়েছে। ইচ্ছা করলেই তাঁকে নাই করে দেওয়া যাবে। হা হা হা!

ইয়াহিয়া খান মনে মনে বললেন, শেখ মুজিব বড় নেতা হইছে না! স্বায়ত্তশাসন চায়? তার কত বড় সাহস! কত বড় কলিজা! এখন বোঝো! স্বায়ত্তশাসনের বারোটা বাজছে না! স্যারকে খবরটা দেওয়ার পর তিনি নিশ্চয়ই আমার চেয়েও বেশি খুশি হবেন! কারণ শেখ মুজিবই তো তাঁর প্রধানতম শত্রু! শত্রুর এমন পরিণতি জানতে পারলে কে না খুশি হয়! স্যার আমাকে অনেক দিয়েছেন। আমি স্যারকে কিছুই দিতে পারি নাই। কয়েক বছর ধরে যাকে নিয়ে তিনি সবচেয়ে বেশি টেনশন করছেন, সে এখন আমাদের কবজায়। কারাগার থেকে ক্যান্টনমেন্টে! এটা স্যারের জন্য নিশ্চয়ই আমার পক্ষ থেকে বড় উপহার! স্যার খুব চিন্তা করছিলেন, তাকে ফাঁসানোর উপায় কী? দিলাম আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ফাঁসিয়ে!

ইয়াহিয়া খান নিজের বুদ্ধির তারিফ নিজেই করেন। আর হা হা হো হো করে হাসতে থাকেন। তাঁর কীর্তি দেখে ড্রাইভার মনে মনে বলে, স্যার কি পাগল হয়ে গেল! কেন পাগল হইল!

এর মধ্যেই গাড়ি প্রেসিডেন্ট সাহেবের বাসভবনের সামনে গিয়ে পৌঁছল। প্রেসিডেন্ট সাহেবের সিকিউরিটি বিভাগকে আগে থেকেই জানানো হয়েছিল। ফলে তাঁর বাসভবনে ঢুকতে খুব একটা বেগ পেতে হলো না। তিনি বাসভবনে ঢুকে ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসলেন। চা-নাশতা খেলেন। টি-টেবিলের ওপর রাখা টাইম ম্যাগাজিন, নিউজ উইকের পাতা ওল্টান। বিভিন্ন আর্টিকেলের ওপর চোখ বোলান। হঠাত্ প্রেসিডেন্ট সাহেব ড্রয়িংরুমে ঢুকে বললেন, কী ব্যাপার খান সাহেব? এই সাতসকালে আমার বাসায়!

ইয়াহিয়া খান হাসি হাসি মুখ করে প্রেসিডেন্ট সাহেবকে সালাম করলেন। তাঁর মুখ দেখে প্রেসিডেন্ট সাহেব ধারণা করলেন, কোনো একটা সুখবর নিয়ে তিনি তাঁর বাড়িতে হাজির হয়েছেন। তিনি জেনারেল সাহেবকে সাদরে গ্রহণ করলেন। তারপর তিনি ইয়াহিয়া খানের সামনের সোফায় বসলেন।

ইয়াহিয়া খান কোনো ভণিতা না করে বললেন, স্যার, একটা সুখবর নিয়ে এসেছি। ভাবলাম আপনাকে সবার আগে সুখবরটা দেওয়া দরকার।

আপনি সুখবর নিয়ে এসেছেন, এ তো আনন্দের কথা! বলেন, বলেন! সুখবরটা কী, শুনি!

স্যার, শেখ মুজিবকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

আমি জানি।

আপনি জানেন!

হ্যাঁ।

বলেন কী স্যার! কে বলল আপনাকে?

মোনেম খাঁ।

মোনেম খাঁ!

তার তো জানার কথা না, স্যার!

কেন জানার কথা না? সে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর। সে জানবে না!

জি স্যার। তা জানতে পারে। গোপন সূত্রের ভিত্তিতে হয়তো জেনেছে। কাজটা তো স্যার আমরা করেছি। তার নাম আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ঢুকিয়েছি।

সে জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। বুদ্ধিটা বেশ ভালো। আমার পছন্দ হয়েছে।

সত্যি পছন্দ হয়েছে স্যার?

হ্যাঁ।

ধন্যবাদ স্যার।

আমি আপনার এই স্পিরিটকে মূল্য দিই। আমার কাজটাকে আপনি নিজের কাজ মনে করেন। আমি যাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি টেনশন করি তাকে আপনি কৌশলে বড় একটা মামলায় ঢুকিয়েছেন। মোনেম খাঁও খুব ভালো মানুষ। তিনি এবং আপনি উভয়েই আমাকে খুব ভালো রিড করতে পারেন। আমি ইঙ্গিত করলেই উনি বুঝতে পারেন, কী চাই। এ জন্যই আমি তাঁকে খুব প্রিভিলেজ দিই।

জি স্যার।

তবে তাঁর চেয়ে আপনার অবস্থান অনেক ওপরে। সেটা নিশ্চয়ই আপনি বুঝতে পারেন।

জি স্যার। ধন্যবাদ স্যার। আমিও খুব খুশি স্যার এবং গ্রেটফুল! আপনি আমাকে অনেক দিয়েছেন।

চলেন নাশতা করি।

আমি খেয়েছি স্যার।

আরেকবার আমার সঙ্গে খান।

ধন্যবাদ স্যার।

আইয়ুব খান ডাইনিংরুমের দিকে এগিয়ে যান। আইয়ুব খান বসার পর ইয়াহিয়া খান বসেন। তারপর খাওয়া শুরু করেন। প্রেসিডেন্ট সাহেব খেতে গিয়ে টের পান, খাবারটা বিস্বাদ লাগছে। এত চমত্কার খাবার কেন বিস্বাদ লাগছে, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তিনি ইয়াহিয়া খানকে উদ্দেশ করে বলেন, ইয়াহিয়া, খাবার ঠিক আছে তো?

ইয়াহিয়া খান বলেন, জি স্যার, ঠিক আছে। খুবই মজা হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট সাহেবের মনের মধ্যে শঙ্কা কাজ করে। তিনি মনে মনে বলেন, শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তারের পর থেকে এমন টেনশন লাগছে কেন! তাকে হজম করতে পারব তো? নাকি বদহজম হবে!

ইয়াহিয়াকে উদ্দেশ করে প্রেসিডেন্ট সাহেব বললেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন তো! নাকি হিতেবিপরীত হবে?

আলবত পারব স্যার। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।

না, মানে জনগণ যদি মাঠে নেমে যায়, তাহলে তো সমস্যা!

স্যার, মাইরের ওপর ওষুধ নাই। আর্মির মাইর কাকে বলে তা বাঙালি ভালো করেই জানে!

ভাসানী সাহেব তো উল্টাপাল্টা করছেন। তিনি হঠাত্ উল্টে গেলেন কেন বুঝলাম না!

আমিও তাই ভাবি স্যার। উনি তো বরাবরই আপনার লোক ছিলেন। গ্যাপ হলো কেমনে, স্যার?

বুঝতে পারছি না। উনি এখন আর আমাকে পছন্দ করছেন না। সভা-সমাবেশে সমালোচনা শুরু করেছেন।

তাঁকেও কি সাইজ করতে হবে, স্যার?

এখনই সাইজের চিন্তা না করা ভালো। মুজিবকে সামাল দিতে পারলে অন্যগুলোকে সাইজে রাখা কোনো ব্যাপার না।

জি স্যার। একদম ঠিক কথা। স্যার, একটা কাজ করলে কেমন হয়?

কী কাজ? প্রেসিডেন্ট সাহেব জানতে চাইলেন।

সারা দেশে সাদা পোশাকে আর্মি নামিয়ে দিই। কোথাও কেউ কোনো সভা-সমাবেশ, মিছিল বের করলে তারা ট্যাকেল দেবে।

ট্যাকেল দেওয়ার দরকার নেই। ট্যাকেল দিতে গেলে গণধোলাইও খেতে পারে। তারা যদি তথ্য সংগ্রহ করে পুলিশকে জানায়, সেটা অনেক উপকারে লাগতে পারে।

জি স্যার। তাই করা হবে। আর প্লিজ স্যার, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আমি যা ব্যবস্থা নেওয়ার নেব।

ধন্যবাদ ইয়াহিয়া। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনি তাহলে যান। পরে আবার কথা হবে। আর ভালো-মন্দ যা-ই কিছু ঘটুক, আমাকে জানাবেন। অলওয়েজ বি ইন টাচ উইথ মি!

জি স্যার। আপনি ভালো থাকবেন স্যার।

ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্টের বাসভবন থেকে বের হলেন। প্রেসিডেন্ট সাহেব তাঁকে বিদায় দিয়ে বেডরুমে গেলেন। বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন। স্ত্রীকে বললেন, আজ আমার মন ভালো নেই। রাতে ঘুম হয়নি। আমি এখন একটু বিশ্রাম নেব। আমার যতই জরুরি ফোন আসুক, আমাকে ডাকবে না। আমার যখন ঘুম ভাঙবে তখন আমি নিজেই উঠে যাব।

বেগম আইয়ুব মাথা নেড়ে তাঁর কথায় সায় দিলেন।

মোনেম খাঁ বারবার প্রেসিডেন্ট সাহেবের নম্বরে ফোন করছেন। কিন্তু কেউ ফোন ধরছেন না। মোনেম খাঁ মনে মনে বলেন, হঠাত্ প্রেসিডেন্ট সাহেবের কী হলো! ফোন কেন ধরছেন না! তিনি না ধরতে পারলে অন্য কেউ তো ধরবেন! কী ব্যাপার! কোনো সমস্যা হয়নি তো!

মোনেম খাঁ ঘরের মধ্যে পায়চারি করেন। অজানা এক আতঙ্কে তিনি ভুগছেন। তাঁর কাছে মনে হচ্ছে, দেশের পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। আগেভাগে কিছু না করলে বড় কিছু ঘটে যেতে পারে। এ ধরনের নানা ভাবনা মোনেম খাঁর মাথায় ঘুরপাক খায়। এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট সাহেবকে না পেয়ে তাঁর দুশ্চিন্তা আরো বাড়ে। তিনি রীতিমতো ছটফট করতে থাকেন। ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর টেলিফোনের রিং বেজে ওঠে। তিনি দৌড়ে গিয়ে ফোনের রিসিভার তুললেন। তারপর উদ্বেগের সঙ্গে বললেন, হ্যালো!

টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভারী গলায় আওয়াজ এলো, আমি আইয়ুব খান বলছি। কী খবর গভর্নর সাহেব? কোনো সমস্যা?

স্যার, দেশের পরিস্থিতি তো ভালো মনে হচ্ছে না!

কেন, কী হয়েছে?

স্যার, শেখ মুজিবকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আসামি করার পর থেকে পরিস্থিতি কেমন যেন পাল্টে গেছে। মনে হচ্ছে মানুষজন আরো বেশি বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে।

তাই নাকি! চোখ-কান খোলা রাখেন।

চোখ-কান তো খোলাই রাখি স্যার। তার পরও পরিস্থিতিটা ঠিক ভালো ঠেকছে না।

সারা দেশে পুলিশ বাহিনীকে সতর্ক করেন। কোথাও যেন কোনো অঘটন ঘটাতে না পারে। আমি সেনাপ্রধানকেও বলে রেখেছি। আমারও মনে হচ্ছে, কিছু একটা ঘটানোর পাঁয়তারা চলছে।

স্যার, আরেকটা কথা। ভাসানী সাহেব কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে চলে গেছেন। ওনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত কী?

ঢাকায় যেন কোনো সভা-সমাবেশ করতে না পারে! পত্রিকাগুলোও যেন তাঁর বক্তৃতা-বিবৃতি না ছাপে। আগেভাগেই সবাইকে সতর্ক করেন।

জি স্যার। আমি এখনই ব্যবস্থা নিচ্ছি।

আজ তাহলে রাখি। পরে আবার কথা হবে।

জি স্যার।

টেলিফোন রেখে মোনেম খাঁ চেয়ারের ওপর বসলেন। ঝিম মেরে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। চোখ বন্ধ করে ভাবেন, কী করা যায়। গভীর ভাবনায় ডুবে যান তিনি।

এই রকম আরও খবর দেখুন

সর্বশেষ আপডেট

অ্যার্কাইভ ক্যালেন্ডার
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১