স্মৃতিতে বুলবুল চৌধুরী, একজন খাঁটি মোমিন-মোত্তাকী হিসেবেই খুব কাছ থেকে দেখেছি

ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান:-


প্রতিদিন কত কিছুই না নিয়ে লেখালেখি করি, এর কোনো ইয়ত্তা নেই। আর সব লেখাই লিখি অনেকটা মনে আনন্দ নিয়েই। কারণ যখন মন চায় কোনো বিষয়ে লিখতে তখন ওই লেখাকে বেশ এনজয় করি। ওই বিষয়ে লেখা শেষ না করা পর্যন্ত ঘুম হারাম। আর লেখাটা শেষ করে যখন পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করতে পারি তখন আরো বেশি আনন্দ পাই।
কিন্তু আজ আমার অবস্থা একেবারেই বিপরীত। হাত কাঁপছে, বুক থরপর করছে। বারবার গাল গড়িয়ে দু’চোখের পানি ঝরছে। নীরবে নিবৃত্তে কাঁদছি, এ কান্না যেন কোনোভাবেই থামাতে পারছি না। এরপরও লিখছি। না লিখলে যে নিজেকে আরো বেশি অপরাধী মনে হবে!তাই নিজের আবেগ-অনুভুতিটুকু অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করে নিজের বেদনা কিছুটা সংবরণ করার চেষ্টা করছি।

সুপ্রিয় পাঠক, জানি আপনারা আমাকে অনেক ভালবাসেন, আমার লেখা পাঠ করতে অনেক পছন্দ করেন। কেননা, ইতোপূর্বে লেখা প্রকাশের পর আপনাদের কাছ থেকে উৎসাহব্যঞ্জক অগণিত চিঠি, ই-মেইল ও ফোন পেয়েছি। আপনারা উল্লেখ করেছেন, ‘আমি সময়োপযোগী লেখা লেখি, তাতে এসব লেখা আপনাদের মনের খোরাক জোগায়।’সুপ্রিয় পাঠক, আজ প্রথমেই আপনাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কারণ, আজকের লেখাটি হয়তো কারো মনের খোরাক জুগাবে না,হয়তো সমাজকেও স্পর্শ করবে না। লেখাটি একেবারেই আমার নিজের আবেগ, অনুভুতি ও ভালবাসা, দুঃখ-বেদনা নিয়ে। থাক এসব কথা, এবার ফিরে আসি আমার আজকের আলোচ্য বিষয়ে।

বয়সে অনেক বড়। সম্পর্কটা সমবয়সী বন্ধুর মতো। সদা হাস্যোজ্জ্বল মুখ, প্রাণবন্ত হাসি। বড় ভাই বলেই ডাকতাম, আমাকেও ছোট ভাইয়ের মতোই আদর-স্নেহ করতেন, ভালবাসতেন। কখনো কখনো অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন। সেই মানুষটি আর কেউ নন,আমাদের সবাইকে ছেড়ে অজানার দেশে চলে যাওয়া রাজশাহীর সবার প্রিয় সাংবাদিক মরহুম বুলবুল চৌধুরী। তার সাথে আমার সম্পর্কটা খুব বেশি কাল আগের না হলেও তাকে নিয়ে আজ অনেক স্মৃতিই মনে পড়ছে।

সদা হাস্যোজ্জ্বল প্রাণবন্ত মানুষটির এভাবে দ্রুত চলে যাওয়ার ঘটনায় বারবার মনে পড়ছে বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক তারা শঙ্করের সেই অমর উক্তি, ‘জীবন এত ছোট কেন?’

ঠিক কখন থেকে তার সাথে পরিচিত হয়ে উঠেছি তা আজ স্মৃতিতে নেই। তবে বলতে পারি- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে অধ্যয়নকালেই তার নামের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম।কেননা,বরাবরই তিনি ছিলেন একজন সৎ ও সাহসী সাংবাদিক।রাজশাহীর খ্যাতিমান সাংবাদিকদের মধ্যে অন্যতম।

এরপর ১৯৯৯ সালের দিকে সাংবাদিকতা হাতেখড়ি ঠিক তখন থেকেই রাজশাহীর সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিচিত হতে থাকি।বুলবুল চৌধুরী ছিলেন অনেক সিনিয়র সাংবাদিক,মতাদর্শে বাম রাজনীতিতে বিশ্বাসী এবং রাজশাহী মেট্রোপলিটন প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন।। ফলে প্রথম দিকে তার সঙ্গে উঠাবসায় কিছুটা ইতস্তত ছিল আমার। এরপর যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে পিএইচডি গবেষণারত এবং ২০০৯ সালে দৈনিক আমার দেশের রাজশাহী ব্যুরো চীফ হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করি ঠিক সেসময়ে তিনি কয়েক বছর বিরতির পর দৈনিক যুগান্তরের ব্যুরো চীফ হিসেবে কাজ শুরু করেন তখন থেকেই মূলত তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা বাড়তে।

একপর্যায়ে সখ্যতা এতোটাই গভীর হয় যে, তার জীবনের প্রায় সব বিষয়ই আমার সঙ্গে কমবেশি ভাগাভাগি করেছেন ২০১১ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত এমন কোনো দিন ছিল না যেদিন আমাকে ফোন করেননি।কোনো বড় প্রোগাম হলে কিংবা সংবাদ হলে আমাকেই তিনি সর্বপ্রথম ফোন দিতেন।সত্য-ন্যায়ের প্রতি এতোটাই অবিচল ছিলেন যে- তার মত মহৎ ও গুণীজন রাজশাহীর সাংবাদিকদের মধ্যে নেই বললেই চলে (হাতেগোনা ২/১ ছাড়া)। আগেই বলেছি- যৌবনে তিনি বাম ধারার রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন,শেষ জীবনে এসে তিনি রাজনীতি নিয়ে তেমন একটা ঘাটাঘাটি করেননি।নিউজের ক্ষেত্রেও কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেননি।কারো কঠোর সমালোচনা করতেও দেখিনি। যৌবনে কিভাবে চলেছেন জানি না, তবে শেষ জীবনে তাকে একজন খাঁটি মোমিন-মোত্তাকী হিসেবেই খুব কাছ থেকে দেখেছি।

আল-কোরআনের সুরা মোমিনুনে এবং মুসলিম শরীফের হাদিসে একজন খাঁটি মোমিনের যেসব গুণাবলীর বর্ণনা রয়েছে এর প্রায় সবক’টিই তার মধ্যে দেখিছি। মৃত্যুর বছর তিনেক আগে মহান আল্লাহর পবিত্র ঘর কাবা শরীফও তাওয়াফ করে গেছেন। অর্থাৎ নামাজ, রোজা, হজ,যাকাত থেকে শুরু করে ইসলামের সব গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতই তিনি তাকওয়ার সঙ্গে পালন করে গেছেন বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় ও সখ্যতা ছিল আমার জীবনের বড় পাওনা। মহান আল্লাহ তার কৃতকর্মের সর্বোচ্চ পুরস্কার দান করুন এ কামনাই করি সর্বদা।

বুলবুল চৌধুরী কেমন দক্ষ ও সৎ সাংবাদিক দিলেন এটা রাজশাহীর সাংবাদিকরা তো বটেই ঢাকার খ্যাতিমান সাংবাদিকরাও বেশ অবগত আছেন। ফলে সেদিকে আমি আলোচনা করে পাঠকের বিরক্তি ঘটাতে চাই না। শেষ জীবনে তিনি ব্যবসার পাশাপাশি সাংবাদিকতা করতেন। কিন্তু সেই ব্যবসাও তেমন একটা ভাল যায়নি বলে এ নিয়ে তার অনেক উদ্বেগ ছিল।তিনি মাঝেমধ্যেই ফোন করে তার ব্যবসায়িক চেম্বারে (রাণীবাজার) আমাকে ডাকতেন।তার এমন ডাকে সাড়া দিয়ে সেই চেম্বারে কতদিন যে গিয়েছি এবং কত সময় যে গল্প করে কাটিয়েছি সেটা শুধু মহান আল্লাহই বেশি অবগত। সেখানে তার ইমামতিত্বে অনেকবার নামাজ আদায় করেছি, রমজানে ইফতার করেছি। শুধু যে তার চেম্বারেই যেতাম এমনটি নয়, কাজের চাপে কখনো যেতে না পারলে গাড়িতে করে নিজেই চলে আসতেন আমার অফিসে (সোনাদিঘী মোড়-বাবলুর বাড়ি)। এ সংখ্যাটাও একেবারে কম নয়। যতদূর মনে পড়ে, ২০১৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ রাত আনুমানিক রাত সাড়ে ৯ থেকে ১০টা ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন ‘(আনিছ ভাই) আপনি কোথায়’ আমি বললাম অফিসে। কিছুক্ষণ পরেই চলে আসলেন এবং নানা বিষয়ে গল্প করে রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টা/১টার দিকে বাসায় ফিরলেন। এ রকম গল্প যে কতদিন করেছেন তার ইয়ত্তা নেই। আজ সেসব স্মৃতিই বারবার মনে পড়ছে।

সেদিন তার আলোচনায় উঠে এসেছিল রাজশাহীর সাংবাদিকতার অনেক গল্পই। সেদিন তার মুখে অনেক সাংবাদিকের প্রশংসার কথাও যেমন শুনেছি তেমনি অনেক সাংবাদিকের ভেতরকার কুৎসিত রূপের কথাও শুনেছি। সামনে শ্রদ্ধা করলেও অনেকে তাকে নিদারণ কষ্টও দিয়েছেন নানা বিষয়ে। যাক সেগুলো আর এখানে উল্লেখ করে কাউকে ছোট করতে চাই না। তবে রাজশাহীর লোকজনের মধ্যে এটা কারো অস্বীকার উপায় নেই যে- রাজশাহীর সাংবাদিকদের মধ্যে নানা বিভাজনের মধ্যেও বুলবুল চৌধুরী ছিলেন সবার শ্রদ্ধারপাত্র। অন্য কোনো কারণে নয়, সৎ ও সাহসী সাংবাদিকতার কারণেই তিনি এই আসনে ছিলেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

আমার দেশ পত্রিকা বন্ধের বেশ কয়েকমাস পর ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমি যখন রাজশাহী ছেড়ে চলে আসি, সেটা তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি। অনেকভাবে বুঝানোর পর শেষ পর্যন্ত কিছুটা ইতস্ততার সুরেই আমাকে তার প্রতিষ্ঠানে তথা দৈনিক যুগান্তরে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তার কথা না রেখে রাজশাহী ছেড়ে ঢাকায় চলে আসি। চলে আসার পরও মাঝেমধ্যেই ফোন দিয়ে খোঁজখবর নিতেন। ২০১৪ সালে তার বড় মেয়েকে যখন ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করান সেটা আমার সঙ্গে পরামর্শ করেই করিয়েছিলেন। এমন কী মৃত্যুর ১৫/২০ দিন আগেও আমাকে ফোন করেছিলেন শ্রদ্ধেয় বুলবুল ভাই। কিন্তু সেদিন আমি তার ফোন ধরতে পারেনি এবং পরে তাকে ফোনও করা হয়ে উঠেনি।

আজ মনে হচ্ছে- বুলবুল ভাই চলে যাওয়ার আগে হয়তো আমাকে কিছু বলতে চেয়েছিলেন, নয়তো তার শেষ বিদায়ের কথাই বলতে চেয়েছিলেন। আমার দুর্ভাগ্য তার সঙ্গে আমার শেষ কথা হল না। তাই আজ নিজেকে অনেক বেশি অপরাধী মনে হচ্ছে, চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে- হে বুলবুল চৌধুরী, আমাকে ক্ষমা কর। তোমার শেষ ফোনটি আমি ধরতে পারেনি, জানতে পারিনি তোমার শেষ কথা! এমন কী তোমার জানাযা নামাজেও শরীক হতে পারিনি। অথচ তোমার অকৃত্রিম ভালবাসার ঋণ কোনো দিন শোধ করার নয়।

হে বুলবুল ভাই,আমাকে ক্ষমা কর। আমি খুবই অকৃতজ্ঞ। তোমার রচিত ভালবাসার ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে তোমাকে ভুলে গেছি।তোমার কর্ম ও অবদানের প্রতি অবিচার করছি। এরপরও আশা করি পরপারে তুমি ভাল আছো। আমরাও তোমার জন্য দোয়া করি- তুমি ভাল থাক। অচিরেই আমরাও তোমার সঙ্গে মিলিত হবো।আমরা তোমাকে স্মরণ করতে ভুল করলেও তোমার কর্ম ও কীর্তি তোমাকে পৃথিবীর বুকে স্মরণীয় করে রাখবে চিরকাল। দলমত নির্বিশেষে রাজশাহীর কৃতজ্ঞ ব্যক্তিরা শ্রদ্ধাভরে তোমাকে স্মরণ করবে আজীবন। কবরে তুমি ভাল থাক। মহান আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন।সেই সঙ্গে মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করি, অকালে তোমাকে হারিয়ে তোমার স্ত্রী-সন্তানেরা যে বিশাল শূণ্যতায় গভীরভাবে শোকাহত তাদেরকে ধৈর্য্যধারণ এবং শোক সইবার তৌফিক দান করুন। আমিন।

সবশেষে, রাজশাহীর সাংবাদিকদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ- আমাদের ও ভবিষ্যত প্রজন্মের অনুপ্রেরণা জন্য মরহুম বুলবুল চৌধুরীর কর্মকে নিয়ে কিছু একটা করা যায় কীনা তা একটু বিবেচনা করবেন। এক্ষেত্রে অন্তত মরহুম বুলবুল চৌধুরীর ওপর একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ এবং একটি স্মৃতি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। অন্যথা, তার কর্ম ও অবদানকে অস্বীকার করে আমরা সবাই অকৃতজ্ঞ হয়ে যাবো। পাঠ্যপুস্তকে পড়েছি, যে জাতি অতীতকে ভুলে যায়, সে জাতি কখনো সামনে অগ্রসর হতে পারে না। আর পৃথিবীতে যেসব জাতি বড় হয়েছে, মাথা উঁচু দাঁড়িয়েছে তারা অতীতকে বুকে ধারণ করেই বড় হয়েছে।

সবাইকে ধন্যবাদ

লেখাটি ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান ভাইয়ের ফেসবুক থেকে নেয়া

এই রকম আরও খবর দেখুন

সর্বশেষ আপডেট

অ্যার্কাইভ ক্যালেন্ডার
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১